বাংলাদেশের জন্য বছরে ১০০ কোটি ডলারের এডিবি অর্থায়ন

DSJ Web Photo ADB
ডিএসজে

বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরও প্রতিযোগিতামূলক ও বিনিয়োগবান্ধব করতে আগামী দিনে বছরে ১০০ কোটি ডলারের বেশি অর্থায়নের একটি পাইপলাইন তৈরি করছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। একই সঙ্গে পরিবহন, লজিস্টিকস, জ্বালানি ও ডিজিটাল সংযোগকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে আঞ্চলিক বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছে সংস্থাটি।

এডিবির দক্ষিণ, মধ্য ও পশ্চিম এশিয়া অঞ্চলের ভাইস প্রেসিডেন্ট ইংমিং ইয়াংয়ের পাঁচ দিনের বাংলাদেশ সফর শেষে সংস্থাটির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। সফরে বাংলাদেশের পরবর্তী কান্ট্রি পার্টনারশিপ স্ট্র্যাটেজি (সিপিএস), অর্থনৈতিক সংস্কার, বেসরকারি বিনিয়োগ, ব্যাংকিং ও পুঁজিবাজার, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং আঞ্চলিক যোগাযোগসহ বিভিন্ন বিষয়ে সরকারের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা হয়েছে।

এডিবি বলছে, বাংলাদেশের পরবর্তী সিপিএসে বেসরকারি খাতনির্ভর অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণ এবং দেশীয় ও বৈদেশিক ধাক্কা মোকাবিলায় অর্থনীতির সক্ষমতা বাড়ানোকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সংস্কার, বিনিয়োগ ও বাস্তবায়ন কাঠামো নিয়েও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।

ইয়াং বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রা এখন এমন একটি পর্যায়ে প্রবেশ করেছে, যেখানে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো, বেসরকারি বিনিয়োগকে কাজে লাগানো এবং অর্থনীতির স্থিতিস্থাপকতা জোরদার করা জরুরি। কৌশলগত অঙ্গীকারকে ধাপে ধাপে সংস্কার, বিনিয়োগযোগ্য প্রকল্প এবং কার্যকর বাস্তবায়নে রূপান্তর করার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।

এই সফরে আলোচনার অন্যতম কেন্দ্র ছিল সরকারের নেতৃত্বে নেওয়া ইন্টিগ্রেটেড গ্রোথ নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট (আইজিএনডি) উদ্যোগ। এডিবির ভাষ্য অনুযায়ী, এই উদ্যোগের আওতায় সরকার ও এডিবি বছরে ১০০ কোটি ডলারের বেশি অর্থায়নের একটি পাইপলাইন চিহ্নিত করেছে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বিনিয়োগ উন্নয়ন নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।

আইজিএনডির লক্ষ্য হলো দেশের বিভিন্ন প্রবৃদ্ধি কেন্দ্র, বাজার এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক মূল্যশৃঙ্খলের মধ্যে সংযোগ শক্তিশালী করা। এর আওতায় অবকাঠামো, লজিস্টিকস, জ্বালানি, নগর উন্নয়ন ও মানবসম্পদে সমন্বিত বিনিয়োগের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরির সুযোগ তৈরি করার কথা বলছে এডিবি।

চট্টগ্রামে আইজিএনডি নিয়ে জাতীয় পর্যায়ের এক প্রচার ও মতবিনিময় সেমিনারে মূল বক্তব্য দেন ইয়াং। সেখানে তিনি প্রবৃদ্ধির কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে বাজার ও আঞ্চলিক-আন্তর্জাতিক মূল্যশৃঙ্খলের সংযোগ বাড়ানোর ওপর জোর দেন। তাঁর মতে, সমন্বিত বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অর্থনৈতিক সুযোগ সম্প্রসারণ করা সম্ভব।

চট্টগ্রামকে ঘিরেও এডিবির আগ্রহ স্পষ্ট হয়েছে সফরে। দেশের প্রধান সামুদ্রিক ও অর্থনৈতিক প্রবেশদ্বার হিসেবে চট্টগ্রামের ভূমিকা এবং আঞ্চলিক যোগাযোগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পরিবহন, লজিস্টিকস, জ্বালানি ও ডিজিটাল সংযোগ শক্তিশালী হলে বাংলাদেশ আঞ্চলিক হাব হিসেবে আরও কার্যকরভাবে গড়ে উঠতে পারে বলে মনে করছে এডিবি।

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের মধ্যমেয়াদি সংস্কার ও উন্নয়ন কাঠামোর সঙ্গে পরবর্তী সিপিএসের অগ্রাধিকার কীভাবে সমন্বয় করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হয়। একই সঙ্গে আইজিএনডির আওতায় অগ্রাধিকার প্রবৃদ্ধি কেন্দ্র নির্ধারণ, বিনিয়োগ প্রকল্প প্রস্তুত করা এবং বাস্তবায়নযোগ্য প্রকল্পের পাইপলাইন তৈরির অগ্রগতিও পর্যালোচনা করা হয়।

বৈঠকে ব্যাংকিং খাত ও পুঁজিবাজারের উন্নয়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়ও উঠে আসে। এ ছাড়া অর্থনীতির বহুমুখীকরণে বেসরকারি খাতকে আরও সক্রিয়ভাবে যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

সফরকালে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আওয়াল মিন্টু, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের সঙ্গেও বৈঠক করেন ইয়াং।

এসব আলোচনায় ব্যাংকিং ও পুঁজিবাজার সংস্কার, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ, জলবায়ু সহনশীল বিনিয়োগ এবং ডিজিটাল রূপান্তরের মতো বিষয় গুরুত্ব পায়। একই সঙ্গে চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং দেশের প্রধান সামুদ্রিক প্রবেশদ্বার হিসেবে এর ভূমিকা নিয়েও আলোচনা হয়।

পরবর্তী সিপিএস তৈরির প্রক্রিয়ায় শুধু সরকারের মতামত নয়, উন্নয়ন সহযোগী, বেসরকারি খাত, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য অংশীজনের মতামতও নেওয়া হচ্ছে। এসব আলোচনায় বিনিয়োগের প্রতিবন্ধকতা, সংস্কার বাস্তবায়নের সীমাবদ্ধতা এবং বেসরকারি মূলধন আকর্ষণের সুযোগগুলো চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।

দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে বৈঠকে এডিবি অর্থায়নের সমন্বয়, যৌথ অর্থায়ন, কারিগরি সহায়তা এবং নীতিগত সহযোগিতার সুযোগ নিয়েও আলোচনা করেছে। আইজিএনডিকে বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর প্রকল্পের পাইপলাইন সমন্বয় এবং অর্থায়ন ও বাস্তবায়নের ঘাটতি দূর করার একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এদিকে চট্টগ্রামে এডিবির অর্থায়নে পরিচালিত ‘স্কিলস ফর ইন্ডাস্ট্রি কম্পিটিটিভনেস অ্যান্ড ইনোভেশন প্রোগ্রাম’-এর কার্যক্রমও পরিদর্শন করেন ইয়াং। শিল্পের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দক্ষতা উন্নয়ন কীভাবে কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা ও শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে পারে, তা তিনি পর্যালোচনা করেন।

ইয়াংয়ের বাংলাদেশ সফরটি এডিবির প্রেসিডেন্ট মাসাতো কান্দার মে মাসের সফরের পর দুই পক্ষের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততার ধারাবাহিকতা আরও জোরালো করেছে। এখন পরবর্তী সিপিএস এবং আইজিএনডির আওতায় সংস্কার ও বিনিয়োগের অগ্রাধিকারগুলো বাস্তব প্রকল্পে কত দ্রুত রূপ নেয়, সেটিই হবে এই অংশীদারিত্বের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

More News

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top