বাংলা কিউআরের আওতায় মার্চেন্ট বাড়ছে, কিন্তু সেই হারে বাড়ছে না লেনদেন। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছে ডিজিটাল পেমেন্টের খরচ এখনো বড় বাধা। এবার সেই বাধা কমাতেই একসঙ্গে দুটি উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক—বাংলা কিউআর লেনদেনে ইন্টারচেঞ্জ রিইমবার্সমেন্ট ফি (আইআরএফ) শূন্য করা এবং ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক মার্চেন্টদের জন্য ১০০ কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল গঠন।
আগামী ১ অক্টোবর থেকে নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আশা, এতে মার্চেন্টদের ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণের খরচ কমবে এবং নগদ টাকার বিকল্প হিসেবে বাংলা কিউআর ব্যবহারের প্রবণতা বাড়বে।
গত ১০ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্ট-২ থেকে জারি করা দুটি পৃথক সার্কুলারের মাধ্যমে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে। সার্কুলার নং-০৩ এবং সার্কুলার লেটার নং-০৬-এর মাধ্যমে দেশের সব ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (এমএফএস), পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার (পিএসপি) এবং পেমেন্ট সিস্টেম অপারেটরকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, প্রায় ২৪ লাখ মার্চেন্টকে ইতোমধ্যে বাংলা কিউআর ব্যবস্থার আওতায় আনা হয়েছে। কিন্তু মার্চেন্টের সংখ্যা বাড়লেও লেনদেনের পরিমাণ সেই অনুপাতে বাড়েনি। এর অন্যতম কারণ হিসেবে লেনদেনে আরোপিত ১ থেকে ১ দশমিক ১৫ শতাংশ মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট (এমডিআর)-কে দেখা হচ্ছে। কম মুনাফায় ব্যবসা করা ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের জন্য এই চার্জ বাড়তি ব্যয় তৈরি করছিল।
এমডিআরের একটি অংশ ইন্টারচেঞ্জ রিইমবার্সমেন্ট ফি বা আইআরএফ হিসেবে লেনদেনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বণ্টিত হয়। নতুন ব্যবস্থায় বাংলা কিউআর লেনদেনে কার্ড বা হিসাব প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের প্রাপ্য এই আইআরএফ পুরোপুরি শূন্য করা হয়েছে। এর ফলে মার্চেন্টদের ওপর আরোপিত এমডিআর কমানোর সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এর পাশাপাশি ডিজিটাল লেনদেন বাড়াতে সরাসরি আর্থিক প্রণোদনাও দেওয়া হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ৪৫১তম সভায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ১০০ কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল অনুমোদন করা হয়েছে।
নির্দেশনা অনুযায়ী, ব্যক্তিক রিটেইল হিসাবধারী ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক মার্চেন্টদের বাংলা কিউআর বা এনপিএসবি লেনদেনের বিপরীতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে প্রণোদনা দেওয়া হবে। প্রতিটি যোগ্য লেনদেনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ২ হাজার টাকা পর্যন্ত লেনদেনের পরিমাণ বিবেচনায় নিয়ে প্রণোদনা কার্যকর হবে।
বাংলা কিউআর লেনদেনে একুয়্যারিং প্রতিষ্ঠান লেনদেনের পরিমাণের শূন্য দশমিক ১০ শতাংশ এবং ইস্যুয়িং প্রতিষ্ঠান শূন্য দশমিক ২০ শতাংশ হারে প্রণোদনা পাবে। অর্থাৎ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিকল্পনায় মার্চেন্টের পাশাপাশি লেনদেন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকেও ডিজিটাল পেমেন্ট সম্প্রসারণে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
তবে প্রণোদনার অর্থ যাতে কৃত্রিম লেনদেন বাড়ানোর হাতিয়ার হয়ে না ওঠে, সে জন্য বেশ কিছু শর্তও দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
কোনো বড় অঙ্কের লেনদেনকে ইচ্ছাকৃতভাবে একাধিক ছোট লেনদেনে ভাগ করে প্রণোদনা নেওয়া যাবে না। একইভাবে কোনো লেনদেন বাতিল, ব্যর্থ, ফেরত বা বিতর্কিত হলে তার বিপরীতে প্রণোদনা দেওয়া হবে না।
কৃত্রিম বা ভুয়া লেনদেন দেখিয়ে প্রণোদনা নেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সেই অর্থ ফেরত নেওয়া হবে। পাশাপাশি ‘পরিশোধ ও নিষ্পত্তি ব্যবস্থা আইন, ২০২৪’ অনুযায়ী সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগের পেছনে মূল লক্ষ্য শুধু একটি পেমেন্ট ব্যবস্থা জনপ্রিয় করা নয়; বরং ছোট ব্যবসার দৈনন্দিন লেনদেনকে ধীরে ধীরে নগদনির্ভরতা থেকে ডিজিটাল ব্যবস্থায় নিয়ে আসা। ক্ষুদ্র দোকান, স্থানীয় ব্যবসা ও প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের জন্য ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণ সহজ হলে লেনদেনের হিসাব সংরক্ষণ, অর্থের নিরাপত্তা এবং ব্যবসার আর্থিক স্বচ্ছতাও বাড়তে পারে।
তবে নতুন প্রণোদনার কার্যকারিতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে মার্চেন্টের প্রকৃত খরচ কতটা কমে এবং গ্রাহক কতটা সহজে বাংলা কিউআর ব্যবহার করতে পারেন তার ওপর। শুধু প্রণোদনা দিয়ে লেনদেন বাড়ানো সম্ভব হবে কি না, সেটিও নজরে থাকবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রত্যাশা, আইআরএফ শূন্য করা এবং ১০০ কোটি টাকার প্রণোদনা—দুই উদ্যোগ একসঙ্গে কার্যকর হলে বাংলা কিউআর ব্যবহারে মার্চেন্টদের আগ্রহ বাড়বে। একই সঙ্গে নগদ অর্থের পরিবর্তে ডিজিটাল লেনদেন বাড়িয়ে ক্যাশলেস বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্যও আরও এগিয়ে যাবে।













