স্বর্ণ খাতকে বৈধ শিল্পে আনতে নতুন নীতিমালা, রপ্তানির পথও খুলবে

DSJ Web Photo Economy
ছবি: বাণিজ্য মন্ত্রণালয়

দীর্ঘদিন ধরে অনানুষ্ঠানিকভাবে পরিচালিত দেশের স্বর্ণ খাতকে এবার পূর্ণাঙ্গ শিল্পে রূপ দিতে চায় সরকার। বৈধ আমদানি, স্বচ্ছ লেনদেন, রাজস্ব আদায়, মূল্য সংযোজন এবং স্বর্ণালংকার রপ্তানির সুযোগ বাড়াতে খসড়া ‘স্বর্ণ নীতিমালা ২০১৮ (সংশোধিত) ২০২৬’ চূড়ান্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নীতিমালা চূড়ান্তের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা ও অংশীজনদের আগামী রবিবারের মধ্যে লিখিত মতামত দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে খসড়া নীতিমালার ওপর আয়োজিত এক সভায় এ নির্দেশনা দেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। সভায় সভাপতিত্ব করেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খান। এতে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাজুস) সভাপতি এনামুল হক খান, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাসান আরিফ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে স্বর্ণ খাত দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও কার্যকর নীতি ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর অভাবে এটি এখনো পূর্ণাঙ্গ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। এজন্য শুধু ব্যবসায়ীদের দায়ী না করে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সীমাবদ্ধতাও বিবেচনায় নিতে হবে।

তিনি বলেন, সরকার এখন এমন একটি কাঠামো গড়ে তুলতে চায়, যাতে স্বর্ণ খাত দেশের অন্যান্য শিল্পের মতো বৈধ ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত হতে পারে। এতে কর্মসংস্থান বাড়বে, বৈধ আমদানি উৎসাহিত হবে, রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে এবং স্বর্ণের মজুদ ও লেনদেনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে।

মন্ত্রী জানান, বৈধভাবে আমদানি করা স্বর্ণের ক্রয়, বিক্রয় ও মজুদের প্রতিটি ধাপ হিসাবের আওতায় আনতে হবে। কোন ব্যবসায়ীর কাছে কত স্বর্ণ রয়েছে, কত বিক্রি হচ্ছে এবং সেই স্বর্ণের উৎস কী—এসব তথ্য নিয়মিতভাবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকির আওতায় থাকবে।

স্বর্ণকে আন্তর্জাতিকভাবে মূল্য সংরক্ষণের অন্যতম স্বীকৃত মাধ্যম উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিশ্বের অনেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ স্বর্ণও রিজার্ভ হিসেবে সংরক্ষণ করে। বাংলাদেশেও বৈধভাবে আমদানি করা স্বর্ণ দেশের ভেতরেই থাকলে সেটি জাতীয় সম্পদের অংশ হিসেবেই মূল্য সংরক্ষণে ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে কম রাখা হলে চোরাচালানের ঝুঁকি তৈরি হবে। তাই শুল্ক ও করহার নির্ধারণের সময় দুবাইসহ আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য বিবেচনায় নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, নতুন নীতিমালার অন্যতম লক্ষ্য শুধু বৈধ আমদানি নয়; দেশে মূল্য সংযোজন করে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণালংকার রপ্তানির সুযোগ তৈরি করাও। যৌক্তিক শুল্কে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বাড়ানো গেলে দেশীয় উদ্যোক্তা ও কারিগররা বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক পণ্য উৎপাদন করতে পারবেন।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও স্বর্ণের বড় চাহিদা রয়েছে। বিশেষ করে বিয়ে ও সামাজিক অনুষ্ঠানে স্বর্ণের ব্যাপক ব্যবহার হওয়ায় নীতিমালায় সাধারণ ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানো গেলে তুলনামূলক ন্যায্য দামে স্বর্ণ কেনার সুযোগ তৈরি হবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।

খসড়া নীতিমালা চূড়ান্ত করার আগে ভারতসহ স্বর্ণালংকার রপ্তানিতে এগিয়ে থাকা কয়েকটি দেশের নীতি, শুল্ক কাঠামো, আমদানি ব্যবস্থা, মজুদ ব্যবস্থাপনা ও রপ্তানি সুবিধা পর্যালোচনা করা হবে বলে জানান বাণিজ্যমন্ত্রী। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশের জন্য কার্যকর ও বাস্তবসম্মত নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে।

তিনি এনবিআর, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সম্ভাব্য ঝুঁকি, বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ লিখিতভাবে জমা দেওয়ার আহ্বান জানান।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, “নীতিমালা করে নতুন কোনো জটিলতা সৃষ্টি করা সরকারের উদ্দেশ্য নয়। দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এমন একটি কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যাতে স্বর্ণ খাত বৈধ, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও টেকসই শিল্পে পরিণত হয়।”

সভায় জানানো হয়, অংশীজনদের মতামত পাওয়ার পর প্রয়োজন হলে আবারও পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর দ্রুততম সময়ের মধ্যে সংশোধিত স্বর্ণ নীতিমালা চূড়ান্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

More News

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top