দেশের অর্ধেকের বেশি খাদ্য উৎপাদন করেন ক্ষুদ্র কৃষকেরা। কিন্তু তাঁদের গড় বার্ষিক আয় বড় কৃষকদের তুলনায় ৭৪ শতাংশ কম। উৎপাদনের মূল ভরসা হয়েও আয়, জমির মালিকানা ও জীবনমানের প্রায় সব সূচকেই তাঁরা পিছিয়ে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ জরিপ বলছে, এসডিজি-২০৩০ অর্জনের পথে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে ক্ষুদ্র কৃষকের আয় ও উৎপাদনশীলতার এই বৈষম্য।
মঙ্গলবার প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘সার্ভে অন ইনকাম অ্যান্ড প্রোডাক্টিভিটি অব স্মল-স্কেল ফুড প্রডিউসার্স ২০২৫’ শীর্ষক জরিপে এ চিত্র উঠে এসেছে। এসডিজির ২.৩.১ (ক্ষুদ্র খাদ্য উৎপাদকদের শ্রম উৎপাদনশীলতা) এবং ২.৩.২ (ক্ষুদ্র খাদ্য উৎপাদকদের গড় আয়) সূচক পরিমাপের উদ্দেশ্যে পরিচালিত এ জরিপে দেশের আট বিভাগের ১২ হাজার ৮৭৯টি কৃষি খামার পরিবারের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
জরিপ অনুযায়ী, দেশের মোট খাদ্য উৎপাদকদের মধ্যে ৫৩ দশমিক ৬৫ শতাংশই ক্ষুদ্র কৃষক। বিভাগভিত্তিক হিসাবে চট্টগ্রামে ক্ষুদ্র কৃষকের হার সবচেয়ে বেশি, ৫৯ দশমিক ৮১ শতাংশ। এরপর রয়েছে রংপুর, যেখানে এ হার ৫৯ দশমিক ২৯ শতাংশ। বিপরীতে সিলেটই একমাত্র বিভাগ, যেখানে বৃহৎ খাদ্য উৎপাদকদের সংখ্যা বেশি।
তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও উৎপাদনশীলতা ও আয়ে ক্ষুদ্র কৃষকেরা পিছিয়ে। জাতীয় পর্যায়ে শ্রম-দিবসপ্রতি গড় উৎপাদনশীলতা ১ হাজার ৮৬৮ টাকা হলেও ক্ষুদ্র কৃষকদের ক্ষেত্রে তা মাত্র ১ হাজার ৪৯৪ টাকা। বিপরীতে বড় কৃষকদের শ্রম-দিবসপ্রতি উৎপাদনশীলতা ২ হাজার ৩০১ টাকা।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি শ্রম উৎপাদনশীলতা মৎস্য চাষে, যেখানে শ্রম-দিবসপ্রতি উৎপাদনের মূল্য ১১ হাজার ৩৮২ টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে স্থায়ী বা বহুবর্ষজীবী ফসল, যেখানে উৎপাদনশীলতা ৬ হাজার ৫৩০ টাকা। তৃতীয় অবস্থানে বনায়ন খাত, ৫ হাজার ৩৯০ টাকা। অন্যদিকে প্রাণিসম্পদ খাতে শ্রম-দিবসপ্রতি উৎপাদনশীলতা সবচেয়ে কম, মাত্র ১ হাজার ৪৫৯ টাকা।
তবে সব ক্ষেত্রেই ক্ষুদ্র কৃষকেরা পিছিয়ে নেই। বহুবর্ষজীবী ফসল উৎপাদনে ক্ষুদ্র কৃষকদের শ্রম-দিবসপ্রতি উৎপাদনশীলতা ৯ হাজার ১৮২ টাকা, যা বড় কৃষকদের ৪ হাজার ৬০৩ টাকার প্রায় দ্বিগুণ। একইভাবে বনায়ন খাতে ক্ষুদ্র কৃষকদের উৎপাদনশীলতা ৬ হাজার ৫১৮ টাকা, যেখানে বড় কৃষকদের ৪ হাজার ৬৫৬ টাকা। বিভাগভিত্তিক হিসেবে ক্ষুদ্র কৃষকদের মধ্যে সর্বোচ্চ শ্রম উৎপাদনশীলতা রাজশাহীতে—২ হাজার ৯৩ টাকা এবং সর্বনিম্ন ময়মনসিংহে—১ হাজার ১৩৫ টাকা।
আয়ের চিত্রে বৈষম্য আরও স্পষ্ট। দেশের সব ধরনের খাদ্য উৎপাদকের গড় বার্ষিক আয় ৭৮ হাজার ২৮৬ টাকা হলেও ক্ষুদ্র কৃষকদের গড় আয় মাত্র ৩৩ হাজার ৬৩৯ টাকা। বিপরীতে বড় কৃষকদের গড় বার্ষিক আয় ১ লাখ ২৯ হাজার ৯৫৬ টাকা। অর্থাৎ বড় কৃষকদের তুলনায় ক্ষুদ্র কৃষকদের গড় আয় প্রায় ৭৪ শতাংশ কম।
জরিপে দেখা গেছে, ক্ষুদ্র কৃষকদের মোট আয়ের ৮৪ দশমিক ৫ শতাংশই আসে প্রাণিসম্পদ খাত থেকে, যার পরিমাণ ২৮ হাজার ৪২১ টাকা। সামগ্রিকভাবেও কৃষকদের সবচেয়ে বড় আয়ের উৎস প্রাণিসম্পদ, যদিও শ্রম উৎপাদনশীলতার দিক থেকে এ খাত সবচেয়ে পিছিয়ে। অর্থনীতিবিদদের মতে, সারা বছর ধারাবাহিক আয় নিশ্চিত হওয়ায় প্রাণিসম্পদ খাত কৃষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আয়ের উৎস হয়ে উঠেছে।
জমির মালিকানার ক্ষেত্রেও বড় বৈষম্য রয়েছে। ক্ষুদ্র কৃষকের গড়ে পরিচালিত জমির পরিমাণ মাত্র ৩৩ দশমিক ৫ ডেসিমেল। অন্যদিকে বড় কৃষকদের গড়ে রয়েছে ১২৩ দশমিক ৫ ডেসিমেল জমি। জরিপের তথ্য বলছে, জমির পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কৃষকের আয়ের সুযোগও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিভাগভিত্তিক হিসেবে ক্ষুদ্র কৃষকদের সর্বোচ্চ বার্ষিক আয় রাজশাহীতে ৪৪ হাজার ৭০৭ টাকা এবং সর্বনিম্ন সিলেটে ২৪ হাজার ৬৩৬ টাকা।
জীবনমানের সূচকেও পিছিয়ে থাকার চিত্র স্পষ্ট। দেশের প্রায় অর্ধেক কৃষক পরিবারের ঘরের মেঝে এখনো মাটির। যদিও ৯৮ দশমিক ২ শতাংশ পরিবারের বিদ্যুৎ সংযোগ রয়েছে, তবু রান্নার জ্বালানি হিসেবে প্রায় ৮৪ শতাংশ পরিবার এখনো কাঠ, বাঁশ, ডালপালা, খড়, পাতা ও তুষের মতো প্রচলিত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। এলপিজি ব্যবহারকারী পরিবারের হার মাত্র ৫ দশমিক ৭ শতাংশ।
সামাজিক সূচকেও একই চিত্র দেখা যায়। কৃষক পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ১৭ শতাংশের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। আবার ক্ষুদ্র কৃষক পরিবারের মাত্র ১০ দশমিক ৭ শতাংশ নারীপ্রধান, যেখানে বড় কৃষক পরিবারের ক্ষেত্রে এ হার মাত্র ৪ দশমিক ৭ শতাংশ।
বিবিএসের জরিপ বলছে, দেশের খাদ্য নিরাপত্তার প্রধান ভিত্তি ক্ষুদ্র কৃষকেরাই। কিন্তু উৎপাদনের মূল চালিকাশক্তি হয়েও আয়, জমির মালিকানা, প্রযুক্তি ব্যবহার, জ্বালানি সুবিধা ও জীবনমানের প্রায় সব সূচকেই তারা বড় কৃষকদের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসডিজি-২০৩০-এর লক্ষ্য অর্জন করতে হলে ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে অর্থায়ন, আধুনিক প্রযুক্তি, বাজারসংযোগ, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং আয় বৈষম্য কমানোর দিকে এখনই কার্যকর নীতি সহায়তা জোরদার করতে হবে।













