২০২৫-২৬ অর্থবছরে কৃষি ও গ্রামীণ খাতে ঋণ বিতরণে নতুন রেকর্ড গড়েছে দেশের ব্যাংকগুলো। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৩ হাজার ৮৩৪ কোটি টাকা বেশি ঋণ বিতরণ করে ব্যাংকগুলো লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করেছে ১০৯ দশমিক ৮৩ শতাংশ। আগের অর্থবছরের তুলনায় বিতরণ বেড়েছে প্রায় ১৫ শতাংশ।
তবে এই ইতিবাচক চিত্রের আড়ালে উদ্বেগও কম নয়। ইসলামিক ব্যাংকগুলো লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে, কমেছে তাদের ঋণ বিতরণ ও আদায়। একই সঙ্গে ইসলামিক ব্যাংকগুলোর মেয়াদোত্তীর্ণ ও শ্রেণীকৃত কৃষি ঋণে বড় ধরনের উল্লম্ফন ভবিষ্যৎ ঝুঁকির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষি ঋণ বিভাগ-১ প্রকাশিত ‘কৃষি ও অ-কৃষি গ্রামীণ ঋণের অবস্থার মাসিক প্রতিবেদন (জুন ২০২৬)’ অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৫৮টি ব্যাংকের জন্য কৃষি ও গ্রামীণ ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৯ হাজার কোটি টাকা। অর্থবছর শেষে বিতরণ হয়েছে ৪২ হাজার ৮৩৪ কোটি ১৬ লাখ টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার ১০৯ দশমিক ৮৩ শতাংশ।
প্রতিবেদন বলছে, বিশেষায়িত ব্যাংকগুলো সবচেয়ে ভালো পারফরম্যান্স দেখিয়েছে। তারা লক্ষ্যমাত্রার ১২৩ দশমিক ৪০ শতাংশ ঋণ বিতরণ করেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো অর্জন করেছে ১০৯ দশমিক ৮৯ শতাংশ, বেসরকারি ব্যাংক ১০৮ দশমিক ৫ শতাংশ এবং বিদেশি ব্যাংক ১০৪ দশমিক ৫ শতাংশ। বিপরীতে ইসলামিক ব্যাংকগুলো ৬ হাজার ৪২১ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে বিতরণ করেছে ৬ হাজার ৫৯ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৯৪ দশমিক ৩৭ শতাংশ।
আগের অর্থবছরের তুলনায় মোট কৃষি ও গ্রামীণ ঋণ বিতরণ বেড়েছে ১৪ দশমিক ৭৬ শতাংশ। বিশেষায়িত ব্যাংকের বিতরণ বেড়েছে ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ২২ দশমিক ৭৪ শতাংশ, বেসরকারি ব্যাংকের ১৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ এবং বিদেশি ব্যাংকের ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ। তবে ইসলামিক ব্যাংকগুলোর কৃষি ঋণ বিতরণ ১ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে।
মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ডিসেম্বর মাসে সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা কৃষি ঋণ বিতরণ হয়। এরপর জানুয়ারিতে বিতরণ প্রায় ৩২ শতাংশ কমে যায়। ফেব্রুয়ারি ও মার্চেও নিম্নমুখী ধারা অব্যাহত থাকলেও এপ্রিলে আবার ২১ দশমিক ৯১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়। অর্থবছরের শেষ মাস জুনে বিতরণ প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়ে ৪ হাজার ৭৫৮ কোটি টাকায় পৌঁছায়, যা শেষ প্রান্তিকে কৃষি অর্থায়নের গতি বাড়ার ইঙ্গিত দেয়।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট কৃষি ঋণের প্রায় অর্ধেকই গেছে ফসল উৎপাদনে। মোট বিতরণের ৪৭ দশমিক ৩২ শতাংশ ফসল খাতে, ২৬ দশমিক ৩৮ শতাংশ গবাদিপশু ও পোল্ট্রি, ১৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ মৎস্য, ১১ দশমিক ৬৮ শতাংশ অ-কৃষি গ্রামীণ কর্মকাণ্ডে বিতরণ হয়েছে। অন্যদিকে সেচ ও কৃষিযন্ত্রে মাত্র শূন্য দশমিক ৯৩ শতাংশ এবং শস্য সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে মাত্র শূন্য দশমিক ৩৭ শতাংশ ঋণ দেওয়া হয়েছে, যা কৃষির আধুনিকায়নে অর্থায়নের সীমাবদ্ধতাই তুলে ধরে।
ঋণের স্থিতিও বেড়েছে। জুন শেষে কৃষি ও গ্রামীণ ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৬৩ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ৫ দশমিক ৫৫ শতাংশ বেশি। কেবল বিদেশি ব্যাংক ছাড়া সব ধরনের ব্যাংকেই ঋণের স্থিতি বেড়েছে।
ঋণ আদায়েও ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। অর্থবছরে মোট আদায় হয়েছে ৪৫ হাজার ৬২৭ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ বেশি। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের আদায় বেড়েছে প্রায় ৪৪ শতাংশ এবং বিদেশি ব্যাংকের ১২০ শতাংশের বেশি। তবে ইসলামিক ব্যাংকগুলোর আদায় কমেছে ১২ দশমিক ৯ শতাংশ।
তবে প্রতিবেদনের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক খেলাপি ও মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ। মোট মেয়াদোত্তীর্ণ কৃষি ঋণ ৮ দশমিক ৪৩ শতাংশ কমে ১৯ হাজার ৮০৭ কোটি টাকায় নেমে এলেও ইসলামিক ব্যাংকগুলোর মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ এক বছরে ৭৩ শতাংশের বেশি বেড়েছে। একইভাবে মোট শ্রেণীকৃত কৃষি ঋণ কিছুটা কমলেও রাষ্ট্রায়ত্ত, বেসরকারি ও ইসলামিক ব্যাংকগুলোর শ্রেণীকৃত ঋণ বেড়েছে। বিশেষ করে ইসলামিক ব্যাংকগুলোর শ্রেণীকৃত কৃষি ঋণ প্রায় দেড় গুণ বেড়ে ৮৮৮ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা ভবিষ্যৎ কৃষি অর্থায়নের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।
অন্যদিকে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের (বিআরডিবি) মাধ্যমে অর্থবছরে কৃষি ঋণ বিতরণ হয়েছে ১ হাজার ৩৩৪ কোটি ২২ লাখ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ৬ দশমিক ৫৫ শতাংশ কম। তবে সংস্থাটির ঋণ আদায় বেড়েছে ২ দশমিক ৭১ শতাংশ।
সব মিলিয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যাংক ও বিআরডিবির মাধ্যমে কৃষি ও গ্রামীণ খাতে মোট ঋণ বিতরণ হয়েছে ৪৪ হাজার ১৬৮ কোটি ৩৮ লাখ টাকা, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১৪ শতাংশ বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, কৃষি অর্থায়নে এই প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও টেকসই কৃষি ঋণ ব্যবস্থাপনার জন্য খেলাপি ও মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ দ্রুত কমানো এবং আদায় কার্যক্রম আরও জোরদার করা এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।













