ঋণ ব্যবসায় ধস, ট্রেজারি আয়ে প্রাইম ব্যাংকের মুনাফায় উল্লম্ফন

DSJ Web Photo BankingSector
ডিএসজে

উচ্চ মূল্যস্ফীতি, টানা সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি, নীতিসুদের ঊর্ধ্বগতি এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের দীর্ঘস্থায়ী ধীরগতির মধ্যে দেশের ব্যাংকগুলোর আয়ের কাঠামোয় বড় পরিবর্তন এসেছে। প্রচলিত ঋণ ব্যবসা থেকে আয় দ্রুত কমে যাওয়ায় অনেক ব্যাংকই ঝুঁকিমুক্ত সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ বাড়িয়ে মুনাফা ধরে রাখার কৌশল নিয়েছে। বেসরকারি প্রাইম ব্যাংক পিএলসির ২০২৪ ও ২০২৬ সালের প্রথমার্ধের আর্থিক ফলাফল সেই পরিবর্তনেরই সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ।

ব্যাংকটির আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, মাত্র দুই বছরে সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ ১২২ দশমিক ৪২ শতাংশ এবং ট্রেজারি বা বিনিয়োগ আয় ১৫৬ শতাংশের বেশি বেড়েছে। বিপরীতে প্রচলিত ঋণ ব্যবসা থেকে আসা নিট সুদ আয় কমেছে ভয়াবহ ৯৩ দশমিক ১৭ শতাংশ। তবে সরকারি সিকিউরিটিজ থেকে বিপুল আয় এবং অন্যান্য ফি-ভিত্তিক আয়ের কারণে কর-পরবর্তী নিট মুনাফা প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়ে ৪৩৩ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

ব্যাংকটির ২০২৪ ও ২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুন মেয়াদের অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুন শেষে সরকারি সিকিউরিটিজে একক (সোলো) বিনিয়োগ ছিল ৯ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা। ২০২৬ সালের জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকায়। বিশেষ করে ‘হেল্ড টু ম্যাচিউরিটি (এইচটিএম)’ ক্যাটাগরির সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ ৬ হাজার ১২১ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১৩ হাজার ৩৫৫ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ দীর্ঘমেয়াদি ও তুলনামূলক ঝুঁকিমুক্ত সরকারি সম্পদে ব্যাংকটির অবস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হয়েছে।

এই কৌশলের সরাসরি প্রতিফলন দেখা গেছে ট্রেজারি আয়ে। ২০২৪ সালের প্রথমার্ধে সরকারি সিকিউরিটিজ ও অন্যান্য বিনিয়োগ থেকে ব্যাংকটির আয় ছিল ৪২৭ কোটি টাকা। ২০২৬ সালের একই সময়ে তা বেড়ে ১ হাজার ৯৩ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

অন্যদিকে ব্যাংকের মূল ঋণ ব্যবসায় প্রবৃদ্ধি ছিল খুবই সীমিত। দুই বছরে মোট ঋণ ও বিলস পোর্টফোলিও মাত্র ৬.৬ শতাংশ বেড়ে ৩২ হাজার ৬৩২ কোটি টাকা থেকে ৩৪ হাজার ৭৮২ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ ট্রেজারি বিনিয়োগের তুলনায় উৎপাদনমুখী ঋণ সম্প্রসারণ ছিল অনেকটাই স্থবির।

তবে আমানত সংগ্রহে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে ব্যাংকটি। ২০২৪ সালের জুন শেষে গ্রাহক আমানত ছিল ৩২ হাজার ৭২৭ কোটি টাকা। দুই বছরের ব্যবধানে তা ৪১.৪ শতাংশ বেড়ে ৪৬ হাজার ২৯৬ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এর বড় অংশ এসেছে মেয়াদি আমানত থেকে।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, আলোচ্য সময়ে মোট সুদ আয় ১৪.৮ শতাংশ বাড়লেও আমানতের বিপরীতে সুদ ব্যয় বেড়েছে ৭০.৬ শতাংশ। ফলে ২০২৪ সালের প্রথমার্ধে ৫০৭ কোটি টাকার নিট সুদ আয় ২০২৬ সালের একই সময়ে কমে মাত্র ৪৮ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। অর্থাৎ প্রচলিত ঋণ ব্যবসা থেকে লাভের মার্জিন প্রায় বিলীন হয়ে গেছে।

তার পরও ট্রেজারি আয়ের জোরে পরিচালন মুনাফা ৮.৫ শতাংশ বেড়ে ৭৪১ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। কর-পরবর্তী নিট মুনাফা বেড়ে হয়েছে ৪৩৩ কোটি টাকা। একই সঙ্গে সমন্বিত শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) ২.৭৫ টাকা থেকে বেড়ে ৩.৫৬ টাকা এবং শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ মূল্য (এনএভিপিএস) ৩১.৭৮ টাকা থেকে ৩৯.৩ টাকায় উন্নীত হয়েছে।

অর্থবাজার বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে উচ্চ সুদহার, বেসরকারি খাতে দুর্বল ঋণচাহিদা এবং খেলাপি ঋণের ঝুঁকির কারণে সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ড ব্যাংকগুলোর জন্য তুলনামূলক নিরাপদ ও লাভজনক বিনিয়োগে পরিণত হয়েছে। প্রাইম ব্যাংকের আর্থিক ফলাফলও দেখাচ্ছে, কোর ব্যাংকিং ব্যবসা থেকে আয় কমলেও ট্রেজারি পোর্টফোলিও সম্প্রসারণের মাধ্যমে মুনাফা বাড়ানো সম্ভব হয়েছে।

তবে তাঁদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংকের টেকসই প্রবৃদ্ধি নির্ভর করে উৎপাদনশীল খাতে ঋণ বিতরণ, সুস্থ নেট সুদ মার্জিন এবং বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর। তাই সরকারি সিকিউরিটিজ থেকে উচ্চ আয় সাময়িকভাবে মুনাফা বাড়ালেও ভবিষ্যতে কোর ব্যাংকিং ব্যবসাকে আবারও শক্তিশালী করাই হবে প্রাইম ব্যাংকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

More News

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top