কম খেলাপি ঋণ, তবু মুনাফায় বড় ধাক্কা মার্কেন্টাইল ব্যাংকের

DSJ Web Photo MercantileBank
ডিএসজে

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে ২০২৬ সালের মার্চ শেষে গড় খেলাপি ঋণের হার পৌঁছেছে ৩২.২৬ শতাংশে। সেখানে মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসির খেলাপি ঋণ মাত্র ৬.৭৮ শতাংশ—যা খাতের গড়ের তুলনায় অনেক কম। সাধারণভাবে এমন ব্যাংকের মুনাফা শক্তিশালী থাকার কথা। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। চলতি বছরের প্রথমার্ধে (জানুয়ারি-জুন) ব্যাংকটির নিট মুনাফা প্রায় ৮৮ শতাংশ কমে গেছে।

ঋণ বিতরণ ও সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ—দুই ক্ষেত্রেই প্রবৃদ্ধি থাকলেও আমানতের বিপরীতে সুদ ব্যয়ের তীব্র বৃদ্ধি, নেট সুদ আয়ের বড় পতন, বিনিয়োগ ও কমিশন আয় কমে যাওয়া এবং প্রভিশন ও করের চাপ মিলেই ব্যাংকটির মুনাফায় বড় ধাক্কা দিয়েছে। মার্কেন্টাইল ব্যাংকের অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে কর-পরবর্তী নিট মুনাফা হয়েছে মাত্র ২৩ কোটি ২ লাখ টাকা। এক বছর আগে একই সময়ে এই মুনাফা ছিল প্রায় ২০০ কোটি টাকা। ফলে শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) ১.৮১ টাকা থেকে নেমে ০.২২ টাকায় দাঁড়িয়েছে।

আর্থিক প্রতিবেদনের বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বড় চাপ এসেছে ব্যাংকের মূল ঋণ ব্যবসা থেকে। আলোচ্য সময়ে সুদ আয় বেড়ে ২ হাজার ১৫৭ কোটি টাকা হলেও আমানত ও ধার করা অর্থের বিপরীতে সুদ ব্যয় দ্রুত বেড়ে ২ হাজার ৪৮ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। ফলে নেট সুদ আয় কমে দাঁড়িয়েছে ১০৮ কোটি ৬৩ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৩৬১ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে নেট সুদ আয় প্রায় ৭০ শতাংশ কমে গেছে।

ব্যাংকিং বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের উচ্চ নীতিসুদের কারণে ব্যাংকগুলোকে আমানতের ওপর আগের তুলনায় অনেক বেশি সুদ দিতে হচ্ছে। কিন্তু ঋণের সুদ একই গতিতে বাড়েনি। ফলে সুদের ব্যবধান বা নেট ইন্টারেস্ট মার্জিন উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ব্যাংকের মুনাফার ওপর।

শুধু সুদভিত্তিক ব্যবসাই নয়, বিনিয়োগ, কমিশন, ব্রোকারেজসহ অন্যান্য আয়ের ক্ষেত্রেও বড় ধাক্কা খেয়েছে মার্কেন্টাইল ব্যাংক। প্রথমার্ধে বিনিয়োগ থেকে আয় হয়েছে ২০৪ কোটি ৮৮ লাখ টাকা, যা আগের বছরের ৪৭৭ কোটি ৫৭ লাখ টাকা থেকে প্রায় ৫৭ শতাংশ কম। একই সময়ে কমিশন, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন ও ব্রোকারেজ আয়ও প্রায় ৩৬ শতাংশ কমে ১০৪ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।

এর ফলে ব্যাংকের মোট পরিচালন আয় কমে ৪৯০ কোটি টাকা হয়েছে, যেখানে এক বছর আগে ছিল প্রায় ৭৭৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ পরিচালন আয় কমেছে প্রায় ৩৭ শতাংশ। পরিচালন ব্যয় কিছুটা কমলেও তা আয় হ্রাসের ধাক্কা সামাল দিতে পারেনি। ফলে প্রভিশনের আগে পরিচালন মুনাফা নেমে এসেছে ৭৯ কোটি ৬৮ লাখ টাকায়, যা আগের বছরের ২৮৬ কোটি টাকা থেকে অনেক কম।

এরপর খেলাপি ঋণ ও অন্যান্য ঝুঁকির বিপরীতে ৩৫ কোটি ৭৬ লাখ টাকা প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়েছে। যদিও প্রভিশনের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় কিছুটা কম, তবে পরিচালন মুনাফা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় এর প্রভাব নিট মুনাফার ওপর অনেক বেশি পড়েছে। পাশাপাশি বর্তমান কর বাবদ আরও ২১ কোটি ৫৩ লাখ টাকা সংরক্ষণ করায় শেষ পর্যন্ত নিট মুনাফা মাত্র ২৩ কোটি টাকায় নেমে আসে।

তবে ব্যাংকের ব্যালান্স শিটে মিশ্র চিত্র দেখা গেছে। জুন শেষে ঋণ ও অগ্রিম বেড়ে ৩০ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা হয়েছে, যা ডিসেম্বরের তুলনায় প্রায় ৫.৫ শতাংশ বেশি। একই সময়ে সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডসহ সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ বেড়ে ১২ হাজার ৬৫৪ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ নিরাপদ সম্পদে বিনিয়োগ বাড়ানোর কৌশল অব্যাহত রেখেছে ব্যাংকটি।

অন্যদিকে আমানতে চাপ স্পষ্ট হয়েছে। ছয় মাসে মোট আমানত কমে ৩৬ হাজার ৮৫৪ কোটি টাকায় নেমেছে, যা ডিসেম্বরের তুলনায় প্রায় ১ হাজার ১২২ কোটি টাকা কম। একই সময়ে অন্যান্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ধার প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ২ হাজার ৭১৬ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। তুলনামূলক ব্যয়বহুল উৎস থেকে তহবিল সংগ্রহের এই প্রবণতা ব্যাংকের সুদ ব্যয় আরও বাড়িয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, মার্কেন্টাইল ব্যাংকের আর্থিক ফলাফল দেখাচ্ছে—বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ খেলাপি ঋণ নয়; বরং নেট সুদ মার্জিন পুনরুদ্ধার, কম ব্যয়ে স্থিতিশীল আমানত সংগ্রহ, বিনিয়োগ ও কমিশনভিত্তিক আয় বাড়ানো। খেলাপি ঋণের হার খাতের গড়ের তুলনায় অনেক কম থাকলেও এই তিন সূচকে দ্রুত উন্নতি না হলে আগামী প্রান্তিকগুলোতেও ব্যাংকটির মুনাফার ওপর চাপ অব্যাহত থাকতে পারে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

More News

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top