সরকারি সিকিউরিটিজে বাড়তি আয়েই টিকে থাকল ঢাকা ব্যাংক

DSJ Web Photo Dhaka Bank
ডিএসজে

ঋণ থেকে সুদ আয় কমেছে ৪৫ শতাংশ। এমন চাপের মধ্যেও সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ থেকে উল্লেখযোগ্য বেশি আয় করে পরিচালন মুনাফার প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে বেসরকারি খাতের ঢাকা ব্যাংক পিএলসি। তবে বেতন-ভাতা, প্রভিশন ও কর ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে (জানুয়ারি-জুন) ব্যাংকটির নিট মুনাফা কমেছে।

ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথমার্ধে নিট মুনাফা হয়েছে ১০০ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ কম। একই সময়ে আমানত, ঋণ ও মোট বিনিয়োগ—তিন ক্ষেত্রেই ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।

আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকের আমানত ছিল প্রায় ৩৩ হাজার ৮৮৪ কোটি টাকা। ২০২৬ সালের জুন শেষে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ১৭১ কোটি টাকায়। সবচেয়ে বেশি কমেছে মেয়াদি আমানত, যার পরিমাণ প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা। তবে আমানত কমলেও সুদ ব্যয় কমেনি। বরং চলতি বছরের প্রথমার্ধে সুদ বাবদ ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৩৮ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৮ কোটি টাকা বেশি।

অন্যদিকে ঋণ বিতরণ মাত্র শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ কমলেও ঋণ থেকে সুদ আয় কমেছে ৫ দশমিক ৭ শতাংশ। ফলে নিট সুদ আয় ২২২ কোটি টাকা থেকে নেমে এসেছে ১২২ কোটি টাকায়। অর্থাৎ ব্যাংকের মূল ঋণভিত্তিক ব্যবসা থেকেই আয় উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয়েছে।

এই চাপ অনেকটাই সামাল দিয়েছে সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ। চলতি বছরের প্রথমার্ধে ট্রেজারি বিল ও ট্রেজারি বন্ড থেকে সুদ এবং মূলধনী মুনাফা মিলিয়ে ব্যাংকটির আয় হয়েছে ৪৮০ কোটি টাকা, যা এক বছর আগে ছিল ৩৪৫ কোটি টাকা। একই সময়ে বেসরকারি বন্ড, শেয়ার ও অন্যান্য বিনিয়োগসহ মোট বিনিয়োগ আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫২১ কোটি টাকায়, যা আগের বছরের তুলনায় ৩৪ শতাংশ বেশি।

বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এই সময়ে সরকারি সিকিউরিটিজে ব্যাংকের মোট বিনিয়োগ বরং কমেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এ খাতে বিনিয়োগ ছিল ১০ হাজার ৯৩৭ কোটি টাকা, যা ২০২৬ সালের জুন শেষে ৪৭৪ কোটি টাকা কমে ১০ হাজার ২৬৩ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।

তাহলে বিনিয়োগ কমলেও আয় বাড়ল কীভাবে?
ব্যাংকিং খাতের ট্রেজারি-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এর প্রধান কারণ উচ্চ সুদের পরিবেশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের কড়াকড়ি মুদ্রানীতির ফলে গত দুই বছরে সরকারি ট্রেজারি বিল ও ট্রেজারি বন্ডের ফলন (ইয়িল্ড) উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে আগের তুলনায় কম পরিমাণ বিনিয়োগ থেকেও বেশি সুদ আয় সম্ভব হচ্ছে।

এ ছাড়া ব্যাংকগুলো কম সুদের পুরোনো সরকারি সিকিউরিটিজের পরিবর্তে বেশি কুপন রেটের নতুন বন্ডে পুনর্বিনিয়োগ করছে। একই সঙ্গে স্বল্পমেয়াদি ট্রেজারি বিলের পরিবর্তে তুলনামূলক বেশি সুদ প্রদানকারী মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি ট্রেজারি বন্ডে পোর্টফোলিও পুনর্বিন্যাস (রি-অ্যালোকেশন) করছে। ফলে মোট বিনিয়োগ কমলেও গড় রিটার্ন বেড়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সুদের হার পরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে কিছু সরকারি সিকিউরিটিজ মেয়াদপূর্তির আগেই বিক্রি করে মূলধনী মুনাফাও অর্জন করা হয়েছে, যা বিনিয়োগ আয়ের প্রবৃদ্ধিতে অতিরিক্ত অবদান রেখেছে।

অন্যদিকে খেলাপি ঋণের ঝুঁকি, উচ্চ প্রভিশন এবং করপোরেট ঋণের তুলনামূলক দুর্বল চাহিদার কারণে ব্যাংকগুলো এখন নিরাপদ সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ঢাকা ব্যাংকের আর্থিক অবস্থানেও সেই প্রবণতার প্রতিফলন দেখা গেছে। ঋণ বিতরণ স্থির থাকলেও বাংলাদেশ ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ব্যাংকটির ধার বেড়ে ছয় মাসের ব্যবধানে প্রায় ৩ হাজার ৩০৭ কোটি টাকা থেকে ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি হয়েছে।

পর্যালোচনায় দেখা যায়, সরকারি সিকিউরিটিজ থেকে বাড়তি আয় পরিচালন মুনাফা ধরে রাখতে সহায়তা করলেও শেষ পর্যন্ত তা নিট মুনাফা বাড়াতে পারেনি। কারণ একই সময়ে বেতন-ভাতাসহ পরিচালন ব্যয়, মন্দ ঋণ ও শেয়ার বিনিয়োগের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণ এবং কর ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে পরিচালন আয় বাড়লেও কর-পরবর্তী মুনাফা প্রায় ১৫ কোটি টাকা কমে যায়।

বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি সিকিউরিটিজে উচ্চ রিটার্ন স্বল্পমেয়াদে ব্যাংকের আয়কে সহায়তা করলেও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য ঋণভিত্তিক ব্যবসার পুনরুদ্ধারই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ব্যাংকের মূল আয়ের উৎস ঋণ কার্যক্রম; ট্রেজারি আয় দিয়ে সেই দুর্বলতা দীর্ঘদিন পুষিয়ে রাখা সম্ভব নয়।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

More News

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top