দেশের টেকসই রাজস্ব প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য করের আওতা সম্প্রসারণ ও রাজস্ব প্রশাসনের পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল রূপান্তর জরুরি বলে মনে করে ফরেন ইনভেস্টরস’ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ফিকি)। বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জিং প্রেক্ষাপটে ব্যবসার ব্যয় হ্রাস করা এবং সব খাতের জন্য সমতাভিত্তিক পরিবেশ নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।
আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর গুলশানে ফিকি কার্যালয়ে আয়োজিত এক বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট সম্পর্কে চেম্বারের বিশদ পর্যবেক্ষণ ও একগুচ্ছ কাঠামোগত সংস্কারের সুপারিশ তুলে ধরেন ফিকি সভাপতি রূপালী হক চৌধুরী।
সংবাদ সম্মেলনে ফিকি সভাপতি বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটটি একটি ইতিবাচক ও তুলনামূলকভাবে পূর্বানুমানযোগ্য বাজেট। বিশেষ করে সামাজিক সুরক্ষা খাতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দ বৃদ্ধিকে আমরা সাধুবাদ জানাই, যা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রান্তিক মানুষের জীবনমানের উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন ঘটবে।
এছাড়া শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে রাখা উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ দীর্ঘমেয়াদে দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে বাংলাদেশ বর্তমানে অনেকাংশে রেমিট্যান্সনির্ভর অর্থনীতি হলেও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে শিক্ষা ও স্কিল ডেভেলপমেন্টে, বিশেষ করে কর্মমুখী শিক্ষার প্রসারে সরকারকে আরও মনোযোগী হতে হবে।
জ্বালানি খাতের সংস্কার প্রসঙ্গে গ্রিন ইনিশিয়েটিভ ও সৌরবিদ্যুৎ খাতে প্রদত্ত প্রণোদনাকে স্বাগত জানিয়ে রূপালী হক চৌধুরী বলেন, এসব উদ্যোগ দেশের জ্বালানি খাতে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে সহায়তা করবে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের ওঠানামার প্রভাব দেশীয় অর্থনীতি ও বিদ্যুৎ খাতের ওপর তুলনামূলকভাবে কম পড়বে। এটি একটি অত্যন্ত দূরদর্শী পদক্ষেপ, যা টেকসই ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের পথে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেবে।
টাকা ও বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ফিকি সভাপতি বলেন, বর্তমানে মূল্যস্ফীতি দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বর্তমান সরকার একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি উত্তরাধিকার হিসাবে পেয়েছে এবং বিদ্যমান প্রায় ৯.৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতি কমিয়ে ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে এই লক্ষ্য অর্জনে সরকারের সুস্পষ্ট কৌশল ও রোডম্যাপ তুলে ধরা প্রয়োজন।
রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাজেটে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে এবং অতীতে এ ঘাটতি পূরণে পরোক্ষ কর ও সম্পূরক শুল্ক বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা গেছে। এতে নিয়মিত করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয় এবং বিভিন্ন খাতে কার্যকর করহার প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বেশি হয়ে যায়। তাই কর ব্যবস্থাকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও বিনিয়োগবান্ধব করা উচিত। এছাড়া বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণনির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প অর্থায়নের উৎস অনুসন্ধানের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা ইতিবাচক হলেও এ বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট নীতিগত দিকনির্দেশনা ও বাস্তবায়ন কৌশল থাকা প্রয়োজন।
করের আওতা সম্প্রসারণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানিয়ে নন-ফাইলারদের কর ব্যবস্থার আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছে ফিকি। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন লাইসেন্স ও অনুমোদন প্রদান এবং নবায়নের ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র (PSR) বাধ্যতামূলক করা, ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রেও পিএসআর চালু করা এবং সরবরাহকারীদের কর রিটার্নের তথ্যের সঙ্গে উৎসে কর কর্তন সংক্রান্ত তথ্যের ৩৬০ ডিগ্রি যাচাই ব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে ফিকির ট্যাক্স কনসালট্যান্ট স্নেহাশীষ বড়ুয়া, এফসিএ চেম্বারের বিস্তারিত কারিগরি পর্যবেক্ষণ উপস্থাপন করেন। রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা ও স্বচ্ছতা বাড়াতে কাস্টমস, ভ্যাট ও আয়কর ব্যবস্থাকে সমন্বিত করে একটি পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন রোডম্যাপ প্রণয়নের আহ্বান জানায় ফিকি। পাশাপাশি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর আন্তঃসংযোগ নিশ্চিত করা এবং বিদ্যমান ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর ধারাবাহিক উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
একটি ন্যায্য ও প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিতের লক্ষ্যে ফিকি এনবিআরের অধীনে একটি বিশেষ ‘ডাটা অ্যান্ড অ্যানালিটিক্স টিম’ গঠনের প্রস্তাব করেছে, যা বিভিন্ন শিল্পখাতে বাজার অংশীদারিত্ব ও রাজস্ব অবদানের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করবে। কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এটিকে একটি দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে অভিন্ন ভ্যাট হার চালু, ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিটের ওপর বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা এবং উৎসে ভ্যাট কর্তন (VDS) ধীরে ধীরে প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়।
বিনিয়োগ আকর্ষণ ও ধরে রাখার লক্ষ্যে বাংলাদেশের কার্যকর করহার (Effective Tax Rate-ETR) যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে আসার জন্য একটি রোডম্যাপ প্রণয়নের আহ্বান জানায় ফিকি। এ লক্ষ্যে তালিকাভুক্ত নয় এমন কোম্পানির জন্য নগদবিহীন লেনদেনভিত্তিক কর সুবিধা পুনর্বহাল, আগামী পাঁচ বছরে ধাপে ধাপে সম্পূর্ণ ক্যাশলেস অর্থনীতির দিকে অগ্রসর হওয়া, বিক্রয়ভিত্তিক ন্যূনতম কর কমানো, অগ্রহণযোগ্য ব্যয়ের তালিকা পুনর্বিবেচনা এবং মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে ব্যক্তিগত আয়কর কাঠামো পর্যালোচনার সুপারিশ করা হয়।
বাণিজ্য প্রতিযোগিতা বাড়াতে কাস্টমস ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরে ফিকি। এ ক্ষেত্রে প্রকৃত লেনদেনমূল্য বা আন্তর্জাতিক রেফারেন্স মূল্যের ভিত্তিতে শুল্ক নির্ধারণ, কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্যের সঠিক শ্রেণিবিন্যাস, মূলধনী যন্ত্রপাতির দ্রুত কাস্টমস ছাড় এবং এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে অশুল্ক বাধা ধীরে ধীরে অপসারণের সুপারিশ করা হয়। এছাড়া পণ্য খালাস প্রক্রিয়া দ্রুততর করতে টাইম রিলিজ സ്റ്റাডি (TRS) পরিচালনা, বৈষম্যহীন ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করতে সব স্তরে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশের মধ্যে সীমিত ও অভিন্ন মূল্য সমন্বয় এবং কাঁচামালের ওপর প্রস্তাবিত সম্পূরক শুল্ক (SD) বৃদ্ধি প্রত্যাহারের আহ্বান জানায় ফিকি।
সংবাদ সম্মেলনে ফিকির সহ-সভাপতি মোহাম্মদ ইকবাল চৌধুরী, পরিচালক হাবিবুর রহমান ভূঁইয়া, নির্বাহী পরিচালক টি আই এম নুরুল কবির এবং চেম্বারের ট্যাক্স কমিটির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। ফিকি পুনর্ব্যক্ত করেছে যে, দেশের ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ উন্নয়ন এবং বিদেশি বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশকে একটি বৈশ্বিক আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে গড়ে তুলতে তারা নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে যাবে। উল্লেখ্য, দেশের অভ্যন্তরীণ প্রায় ৩০% রাজস্ব আয়ে অবদান রাখছে ফিকির সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলো এবং তারা বাংলাদেশে ৯০% এর বেশি অভ্যন্তরীণ এফডিআই-এর প্রতিনিধিত্ব করছে।













