ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের নজিরবিহীন অনিয়ম, দুর্নীতি ও লাগামহীন লুটপাটের সরাসরি খেসারত দিচ্ছে দেশের ব্যাংকিং খাত। ঋণের নামে ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে আর ফেরত না দেওয়া এবং আমদানি-রপ্তানির আড়ালে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করার কারণে পুরো খাত এখন খাদের কিনারায়। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, ব্যাংক খাতে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের বিপরীতে মূলধন সংরক্ষণে (মূলধন পর্যাপ্ততা) দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ এবং শোচনীয় অবস্থায় চলে গেছে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত সর্বশেষ ‘আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন ২০২৫’ থেকে এই উদ্বেগজনক চিত্র জানা গেছে। প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর ব্যাংক খাতে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের বিপরীতে মূলধন রাখার তুলনামূলক হার তুলে ধরা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক নিয়ম (ব্যাসেল-৩ ফ্রেমওয়ার্ক) অনুযায়ী, একটি দেশের ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি মোকাবিলায় ‘মূলধন পর্যাপ্ততা রেশিও’ (সিএআর) ন্যূনতম সাড়ে ১২ শতাংশ থাকতে হয়। সেখানে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে মূলধন পর্যাপ্ততা ন্যূনতম সীমা ছোঁয়া তো দূরের কথা, এটি ঋণাত্মক ২.৬৪ শতাংশে নেমে গেছে।
আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোর ব্যাংক খাতে মূলধন পর্যাপ্ততা ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও একমাত্র বাংলাদেশে তা জ্যামিতিক হারে কমেছে। বিগত বছরগুলোর পরিসংখ্যান খতিয়ে দেখলে স্পষ্ট বোঝা যায়, দেশের ব্যাংক খাতের মূলধন ভিত্তি কীভাবে ধসে পড়েছে।
২০২১ সালে দেশের ব্যাংক খাতে মূলধন পর্যাপ্ততা ছিল ১১.০৮ শতাংশ, যা ২০২২ সালে সামান্য বেড়ে ১১.৮৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল। ২০২৩ সালেও এটি ১১.৬৪ শতাংশ বজায় ছিল। কিন্তু এরপরই ধস নামে; ২০২৪ সালে তা এক ধাক্কায় ৩.৮ শতাংশে নেমে আসে এবং ২০২৫ সালে এসে তা ঋণাত্মক ২.৬৪ শতাংশের চূড়ান্ত তলানিতে গিয়ে ঠেকে।
অথচ একই সময়ে তীব্র অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্ব ও সংকট থেকে রূপকথার মতো ঘুরে দাঁড়িয়েছে শ্রীলঙ্কা। দেশটির ব্যাংক খাত এখন মূলধন সংরক্ষণের ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে। ২০২৫ সালে শ্রীলঙ্কার ব্যাংক খাত ১৯.৪০ শতাংশ মূলধন সংরক্ষণ করেছে, যা ২০২৪ ও ২০২৩ সালে ছিল ১৮.৪ শতাংশ এবং ২০২২ সালে ছিল ১৬.২ শতাংশ।
অন্যদিকে, মূলধন সংরক্ষণে দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে পাকিস্তান। ২০২৫ সালে দেশটির ব্যাংক খাত ২০.৮০ শতাংশ মূলধন সংরক্ষণ করেছে। ২০২৪ সালে পাকিস্তানের এই হার ছিল ২০.৬ শতাংশ, ২০২৩ সালে ১৬.৭ শতাংশ এবং ২০২২ সালে ছিল ১৬.৬ শতাংশ। তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে থাকা প্রতিবেশী দেশ ভারত ২০২৫ সালে ১৭.২০ শতাংশ মূলধন সংরক্ষণ করেছে, যা ২০২৪ সালে ছিল ১৬.৭ শতাংশ, ২০২৩ সালে ১৬.৮ শতাংশ এবং ২০২২ সালে ছিল ১৬ শতাংশ।
খাত সংশ্লিষ্ট ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, মূলধন ও ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের অনুপাত বা ‘সিএআর’ হলো একটি ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা ও স্বাস্থ্য পরিমাপের প্রধান সূচক। ঋণের একটি বিশাল ও সিংহভাগ অংশ প্রভাবশালী খেলাপিদের কাছে আটকে থাকার কারণে ব্যাংকগুলো আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে পারছে না।
নিয়ম অনুযায়ী, খেলাপি ঋণ বাড়লে ব্যাংকের প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে হয়, যা সরাসরি ব্যাংকের মূলধনকে খেয়ে ফেলে। কোনো ব্যাংকের মূলধন এভাবে ঋণাত্মক হয়ে গেলে তার ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ জ্যামিতিক হারে বাড়ে। ফলে ব্যাংকগুলোর নতুন করে বিনিয়োগ বা পুনর্বিনিয়োগ করার ক্ষমতা পুরোপুরি হারিয়ে যায়, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে স্থবির করে দিচ্ছে।











