বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও ভূ-রাজনৈতিক নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও চলতি বছরের মে মাসে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও দ্রুততর সম্প্রসারণের পথে অগ্রসর হয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিট্যান চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) এবং পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ যৌথভাবে প্রকাশিত মে মাসের ‘বাংলাদেশ পারচেজিং ম্যানেজারস ইনডেক্স’ (পিএমআই) প্রতিবেদনে এই ইতিবাচক চিত্র উঠে এসেছে ।
সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে দেশের পিএমআই সূচক আগের মাসের (এপ্রিল) তুলনায় এক ধাক্কায় ৮.২ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে ৬২.৮-এ উন্নীত হয়েছে । এপ্রিল মাসে এই সূচকটি যেখানে ছিল ৫৪.৬ পয়েন্টে, সেখানে মে মাসের এই বড় লাফ দেশের প্রধান খাতগুলোর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গতিশীল হওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।
যুক্তরাজ্য সরকারের অর্থায়নে এবং সিঙ্গাপুর ইনস্টিটিউট অব পারচেজিং অ্যান্ড ম্যাটেরিয়ালস ম্যানেজমেন্টের কারিগরি সহায়তায় তৈরি এই সূচকে মূলত দেশের উৎপাদন এবং পরিষেবা খাতের দ্রুততর প্রবৃদ্ধির প্রতিফলন ঘটেছে । একই সঙ্গে টানা তিন মাসের সংকোচন বা মন্দার বৃত্ত ভেঙে নির্মাণ খাত পুনরায় ইতিবাচক ধারায় অর্থাৎ সম্প্রসারণে ফিরে এসেছে । অন্যদিকে আবহাওয়াজনিত অনিশ্চয়তার কারণে কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধির গতি মে মাসে এসে কিছুটা মন্থর বা ধীর হয়েছে । তবে সামগ্রিকভাবে সূচক ৫০-এর ওপরে থাকা দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার একটি বড় প্রমাণ ।
খাতভিত্তিক গভীর বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের উৎপাদন খাত টানা দ্বিতীয় মাসের মতো সম্প্রসারণের ধারা বজায় রেখেছে এবং মে মাসে এর গতি আরও শক্তিশালী হয়েছে । এই খাতের ব্যবসায়ীরা নতুন অর্ডার, নতুন রপ্তানি, ইনপুট ক্রয় এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছেন । যদিও বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকটের কারণে কারখানা উৎপাদন এবং সমাপ্ত পণ্য সরবরাহ কিছুটা চাপের মুখে ছিল, তবুও আমদানি ও অর্ডার ব্যাকলগ সূচক পুনরায় ইতিবাচক ধারায় ফিরেছে । তবে আগামী দিনগুলোর ব্যবসায়িক পূর্বাভাসের ক্ষেত্রে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের উদ্যোক্তারা কিছুটা সতর্কতা বা সংকোচনের ইঙ্গিত দিয়েছেন ।
পরিষেবা খাত মে মাসে এসে টানা ২০তম মাসের মতো সম্প্রসারণের রেকর্ড গড়েছে এবং প্রবৃদ্ধির গতি আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে । ব্যবসায়িক কার্যক্রম, নতুন কর্মসংস্থান এবং নতুন ব্যবসার জোয়ারে এই খাতটি মুখর ছিল । অন্যদিকে নির্মাণ খাত টানা তিন মাস ধুঁকতে থাকার পর মে মাসে এসে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে । নতুন আবাসন ও অবকাঠামো নির্মাণ কার্যক্রম গতিশীল হওয়ায় এ খাতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পেয়েছে । কৃষি খাতও টানা নবম মাসের মতো তাদের সম্প্রসারণের রেকর্ড টিকিয়ে রেখেছে, যেখানে ব্যবসায়িক কার্যক্রম ও কর্মসংস্থান সূচক বেশ চাঙ্গা ছিল ।
তবে এই বিস্তৃতভিত্তিক ও চোখধাঁধানো অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের আড়ালে দেশের ব্যবসায়িক পরিবেশের অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ ও গভীর উদ্বেগের চিত্রও প্রতিবেদনে সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ী ও উত্তরদাতারা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট, জ্বালানি তেলের দফায় দফায় মূল্যবৃদ্ধি, অতিরিক্ত পরিবহন খরচ এবং শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি মুনাফার মার্জিনকে তীব্রভাবে সংকুচিত করে ফেলেছে । বিশেষ করে তীব্র বিদ্যুৎ বিভ্রাট বা লোডশেডিংয়ের কারণে কলকারখানার উৎপাদন পরিকল্পনা এবং উৎপাদনশীলতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে ।
অভ্যন্তরীণ এই সংকটের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক সংকট নিয়েও দেশের ব্যবসায়ী মহলে গভীর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে । মধ্যপ্রাচ্যে চলমান মার্কিন-ইরান যুদ্ধ ও ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম আরও বাড়লে তা দেশের সরবরাহ শৃঙ্খলকে সম্পূর্ণ ভেঙে দিতে পারে বলে ব্যবসায়ীরা চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন । এর বাইরেও উচ্চ ব্যাংক সুদের হার, আমদানিকৃত চালের বাজার পরিস্থিতি এবং সামগ্রিক দেশীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ধীরগতি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করে রেখেছে ।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এম. মাসরুর রিয়াজ অর্থনীতির এই বৈপরীত্য ব্যাখ্যা করে জানিয়েছেন, মে মাসের পিএমআই সূচক নিশ্চিত করে যে দেশের অর্থনীতি একটি শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির পথে ডানা মেলেছে । উৎপাদন, নির্মাণ এবং পরিষেবা খাতের সম্মিলিত শক্তির কারণেই এপ্রিলের তুলনায় মে মাসে এই বড় লাফ সম্ভব হয়েছে । যদিও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি ব্যয় ও মুদ্রাস্ফীতির চাপ অব্যাহত রয়েছে, তবুও পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে দেশের অভ্যন্তরীণ জোরালো চাহিদা এবং উৎসবকেন্দ্রিক বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের প্রসার এই ক্রান্তিকালেও বিস্তৃতভিত্তিক প্রবৃদ্ধিকে বড় ধরনের সহায়তা জুগিয়েছে ।
ব্যবসায়ীদের একাংশ অবশ্য সমস্ত বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের পরও একটি সতর্ক আশাবাদ ধরে রেখেছেন । তাদের মতে, আসন্ন দিনগুলোতে যদি দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতি করা যায় এবং বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংক ঋণ সহজ করাসহ সহায়ক নীতিগত সহায়তা দেওয়া যায়, তবে দেশের এই প্রবৃদ্ধির গতি আগামী মাসগুলোতে আরও অনেক দূর এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে ।













