দেশের বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানাগুলো পুনরায় সচল করা, ঝিমিয়ে পড়া সামষ্টিক অর্থনীতিতে গতি ফেরানো এবং বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ৬০ হাজার কোটি টাকার এক ঐতিহাসিক ও অভূতপূর্ব পুনঃঅর্থায়ন ও সহায়তা তহবিল ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই বিশাল প্রণোদনা প্যাকেজ পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে দেশে ২৫ লাখেরও বেশি মানুষের নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
শনিবার (২৩ মে ২০২৬) বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের জাহাঙ্গীর আলম কনফারেন্স রুমে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে নতুন এই মেগা স্কিমের বিস্তারিত ঘোষণা করেন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। বিগত কয়েক বছরের অর্থনৈতিক স্থবিরতা এবং শিল্প খাতের রক্তক্ষরণ বন্ধে এটিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সবচেয়ে বড় ও সাহসী নীতিগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা।
সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর মোস্তাকুর রহমান দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে বলেন, “বিগত তিন বছরে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি (জিডিপি) ধারাবাহিকভাবে সংকুচিত হয়েছে। আগে যেখানে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ দশমিক ৮ শতাংশ, পরে তা ৪ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসে এবং বর্তমানে এই প্রবৃদ্ধি আরও কমে ৩ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়াতে পারে বলে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক (আরএমজি), টেক্সটাইল, স্টিল, সিরামিক, তথ্যপ্রযুক্তি এবং ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে।”
গভর্নর আরও যোগ করেন, “বিগত আমলের অনিয়ম ও জালিয়াতির কারণে ব্যাংক খাতে চাপ চরম আকার ধারণ করেছে; খেলাপি ঋণ রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে, বিপুল পরিমাণ অর্থপাচারের ঘটনা ঘটেছে এবং ব্যাংকগুলোর ওপর আমানতকারীদের আস্থা তলানিতে ঠেকেছে। এর ওপর উচ্চ সুদের হারের কারণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা (এসএমই) নতুন করে ব্যবসা সম্প্রসারণে পুরোপুরি নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। এই বহুমুখী সংকট মোকাবিলা করে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে এবং অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতেই আমরা এই বিশেষ স্কিমটি চালু করেছি। এখানে জনতুষ্টিবাদের কোনো স্থান নেই, পুরো তহবিল উৎপাদনশীলতার ভিত্তিতে বণ্টন করা হবে।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত এই ৬০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজটিকে মূলত দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা বিতরণ করা হবে সরাসরি ‘পুনঃঅর্থায়ন স্কিম’ এর আওতায় এবং বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব বিভিন্ন বিশেষ সহায়তা কর্মসূচির মাধ্যমে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত প্যাকেজের অধীনে ৪১ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের সিংহভাগই বরাদ্দ করা হয়েছে উৎপাদনশীল ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙা করার লক্ষ্যে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ অর্থাৎ ২০ হাজার কোটি টাকা রাখা হয়েছে বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প ও সেবা খাত পুনর্গঠনের জন্য। এছাড়া কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য ১০ হাজার কোটি টাকা এবং দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহায়তায় সিএমএসএমই (CMSME) খাতে ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথ সুগম করতে রপ্তানি বহুমুখীকরণ খাতে ৩ হাজার কোটি টাকা এবং দেশের আঞ্চলিক বৈষম্য দূরীকরণে উত্তরবঙ্গকে একটি বিশেষ ‘কৃষি হাব’ হিসেবে গড়ে তুলতে আরও ৩ হাজার কোটি টাকার তহবিল প্রস্তুত করা হয়েছে।
অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব খাতের ১৯ হাজার কোটি টাকার বিশেষ সহায়তা তহবিলটি বিভিন্ন সম্ভাবনাময় ও পিছিয়ে পড়া খাতের উন্নয়নে সুনির্দিষ্টভাবে বিন্যস্ত করা হয়েছে। এই তহবিলের আওতায় প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট রিফাইন্যান্সে ৫ হাজার কোটি টাকা এবং কটেজ, মাইক্রো ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এছাড়া চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য খাতে ২ হাজার কোটি, হিমায়িত মাছ ও ফিশ এক্সপোর্টে ২ হাজার কোটি এবং পরিবেশবান্ধব বা গ্রিন ইনভেস্টমেন্টে ১ হাজার কোটি টাকার জোগান দেওয়া হবে।
তরুণ প্রজন্ম ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানে ১ হাজার কোটি টাকা (কর্মসংস্থান ব্যাংকের মাধ্যমে), গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ১ হাজার কোটি টাকা (আনসার-ভিডিপি ব্যাংকের মাধ্যমে), বিদেশে কর্মসংস্থান সহায়তায় ১ হাজার কোটি টাকা এবং স্টার্টআপ খাতে ৫০০ কোটি টাকা বিতরণ করা হবে। পাশাপাশি, সৃজনশীল অর্থনীতি বা ক্রিয়েটিভ ইকোনমির প্রসারে আরও ৫০০ কোটি টাকা সম্পূর্ণ অনুদান হিসেবে সিএসআর তহবিল থেকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বিশেষভাবে উল্লেখ্য, সৃজনশীল অর্থনীতি বা ক্রিয়েটিভ ইকোনমির জন্য বরাদ্দকৃত ৫০০ কোটি টাকা কোনো ঋণ নয়; এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) তহবিল থেকে সম্পূর্ণ অনুদান হিসেবে দেওয়া হবে।
২৫ লাখ মানুষের ভাগ্যোন্নয়ন ও সুদের মডেলে বড় ছাড়:
বাংলাদেশ ব্যাংক দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেছে যে, এই তহবিল মাঠপর্যায়ে কার্যকর হলে শিল্পকারখানাগুলো সচল হওয়ার পাশাপাশি দেশের প্রধান খাতগুলোতে নতুন প্রাণসঞ্চার হবে। বিশেষ করে, বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য বরাদ্দ ১ হাজার কোটি টাকা থেকে প্রায় এক লাখ দক্ষ শ্রমিকের বৈදේශিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, যা রেমিট্যান্স প্রবাহকে আরও শক্তিশালী করবে। এছাড়া গ্রামীণ অর্থনীতির বরাদ্দটি আনসার-ভিডিপি ব্যাংকের মাধ্যমে বিতরণ করায় আনসার ও ভিডিপির লাখো তৃণমূল সদস্য সরাসরি উপকৃত হবেন।
উদ্যোক্তাদের স্বস্তি দিতে এই ঋণের সুদের হার অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও সহনীয় রাখা হয়েছে। গভর্নর জানান, পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে মাত্র ৪ শতাংশ সুদে তহবিল জোগান দেবে। ব্যাংকগুলো এর সাথে সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ স্প্রেড (মুনাফা) যোগ করতে পারবে। ফলে দেশের বড় বড় উদ্যোক্তারা মাত্র ৭ শতাংশ উচাটনহীন সুদে এই মেগা ঋণ সুবিধা পাবেন। তবে ক্ষুদ্র ঋণের ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা ও তদারকি ব্যয় বেশি হওয়ায় কর্মসংস্থান ব্যাংক বা আনসার-ভিডিপি ব্যাংকের ছোট ঋণগুলোর ক্ষেত্রে সুদের হার তুলনামূলক সামান্য বেশি হতে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রত্যাশা, এই সময়োচিত ও বিশাল তহবিল ছাড়ের ফলে দেশের বন্ধ কারখানাগুলো দ্রুত উৎপাদনে ফিরবে, বেসরকারি খাতে ঋণের খরা কাটবে, রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্সের পালে নতুন হাওয়া লাগবে এবং সামগ্রিকভাবে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি তার হারানো প্রবৃদ্ধির গতিপথ পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হবে।













