৫৫% শুল্কের বোঝা নিয়ে আসিয়ানের সাথে এফটিএ অসম্ভব

Web Photo Card May 21 2026 PRIPreBudget2026
ছবি: পিআরআই

বাংলাদেশে ২০ বছর ধরে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে কথা হচ্ছে, কিন্তু একটি এফটিএ-ও করা যায়নি। এর প্রধান কারণ আমাদের বিশালাকার শুল্ক কাঠামো। বাংলাদেশে বর্তমানে গড় বাণিজ্য করহার ৫৫ শতাংশ। এ ধরনের উচ্চ শুল্ক কাঠামো নিয়ে আসিয়ান বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো বড় জোটের সঙ্গে এফটিএ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

বৃহস্পতিবার (২১ মে) রাজধানীর একটি মিলনায়তনে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই) এবং অস্ট্রেলিয়ান সরকারের ডিপার্টমেন্ট অব ফরেন অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড ট্রেড (ডিএফএটি)-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক বিশেষ গোলটেবিল বৈঠকে দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা এসব কথা বলেন।

পিআরআই-এর সেন্টার ফর ম্যাক্রোইকোনমিক অ্যানালাইসিস (সিএমইএ) আয়োজিত ‘মান্থলি ম্যাক্রোইকোনমিক ইনসাইটস’ কর্মসূচির আওতায় “উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিমুখী সংস্কারের মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার: প্রাক-বাজেট অগ্রাধিকার” শীর্ষক এই আলোচনা সভায় দেশের বর্তমান শুল্ক নীতি এবং সামষ্টিক অর্থনীতির নানা সংকট নিয়ে বিশদ বিশ্লেষণ করা হয়।

সেমিনারে সভাপতিত্ব করতে গিয়ে পিআরআই-এর চেয়ারম্যান ড. জাইদী সাত্তার বাংলাদেশের কমতি বাণিজ্য ঘনত্ব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, দেশের বাণিজ্য প্রবণতা ২০২২ সালের ১৪০ বিলিয়ন ডলার থেকে বর্তমানে ১১০-১১৫ বিলিয়ন ডলারে সংকুচিত হয়েছে, যার ফলে বাণিজ্য-জিডিপি অনুপাত ৪৫ শতাংশ থেকে নেমে এসেছে মাত্র ৩০-৩১ শতাংশে। রপ্তানি জিডিপির ১১ শতাংশ এবং আমদানি ২০ শতাংশে থাকা অত্যন্ত নিম্ন বাণিজ্য ঘনত্ব নির্দেশ করে।

তিনি বলেন, ভারত ইতিমধ্যে এফটিএ করে এগিয়ে গেছে, কিন্তু আমাদের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিই নেই। ফলে প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হলে আমাদের এই বাণিজ্য-নিরোধক সেকেলে মডেল থেকে বের হয়ে এসে অবিলম্বে শুল্ক কাঠামোয় আমূল সংস্কার ও বাণিজ্য উন্মুক্তকরণ করতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের ‘ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চ’-এর গবেষণা উল্লেখ করে জাইদী সাত্তার বলেন, বাণিজ্য ঘনত্ব ১ শতাংশ বাড়লে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ০.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পায়, যা দেশীয় বাজারে মূল্যস্তর কমাতেও সাহায্য করে। কিন্তু আমাদের শিল্পনীতি ও বাণিজ্যনীতি এখন সেকেলে ও অচল হয়ে পড়েছে। চীন বা ভিয়েতনামের মতো বৈশ্বিক বাজারের ওপর নির্ভর না করে শুধু অভ্যন্তরীণ বাজারমুখী প্রবৃদ্ধি মডেল দিয়ে ৭-৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা যাবে না। তাই এলডিসি উত্তর উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় উৎপাদনশীলতা ও মুক্ত বাণিজ্যের দিকে নীতিগত পরিবর্তন এবং আধুনিক একুশ শতাব্দীর শিল্পনীতি গ্রহণ অপরিহার্য।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করে পিআরআই-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান বলেন, “বর্তমান অর্থনৈতিক চাপ থেকে বেরিয়ে আসতে আমরা শুধু সরকারি ব্যয় বাড়িয়ে বা জনতুষ্টিবাদভিত্তিক নীতি দিয়ে পথ খুঁজে পাব না। সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ভিত্তি করে একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ বাজেট এবং উৎপাদনশীলতা-বর্ধক কাঠামোগত সংস্কারই প্রবৃদ্ধির গতি পুনরুদ্ধারের একমাত্র পথ।”

তিনি জানান, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সুদ পরিশোধের ক্রমবর্ধমান চাপ এবং আর্থিক খাতের দুর্বলতার কারণে সরকারের নীতিগত পরিসর এখন অত্যন্ত সংকুচিত। এই পরিস্থিতিতে কৃত্রিমভাবে চাহিদাভিত্তিক প্রবৃদ্ধির উদ্দীপনা দেওয়ার চেষ্টা করা হলে তা মুদ্রাস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করবে। অতএব, আসন্ন ২০২৬-২৭ বাজেটের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত নীতিগত বিশ্বাসযোগ্যতা পুনর্গঠন—যার জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী রাজস্ব আহরণ, বাস্তবসম্মত ব্যয় ব্যবস্থাপনা, ভর্তুকির যৌক্তিকীকরণ এবং ব্যাংক ঋণের ওপর সরকারের দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতা হ্রাস করা।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের কড়া সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “এডিপির দুর্বল বাস্তবায়ন, পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বারবার সময় বাড়িয়ে সরকারি প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি আর্থিক চাপ বাড়াচ্ছে ও উন্নয়নের কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত করছে। শুধু বাজেট বরাদ্দ যথেষ্ট নয়; কার্যকর বাস্তবায়ন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও জরুরি।”

ফাহমিদা আরও উল্লেখ করেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ধারাবাহিক ব্যর্থতায় ব্যাংক ঋণের ওপর সরকারের নির্ভরতা বাড়ছে, যা বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতিকে সরবরাহপক্ষীয় ও আমদানিনির্ভর উল্লেখ করে তিনি বাজার তদারকি, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি নিশ্চিত করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।

প্যানেল আলোচনায় ঢাকা চেম্বারের (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ গত এক দশকের বৈষম্য ও অলিগার্কদের চিত্র তুলে ধরে বলেন, “গত এক দশক ধরে বাংলাদেশ ধারাবাহিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। গুটিকয়েক প্রভাবশালী গোষ্ঠী বা অলিগার্ক ব্যাংকিং খাত নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং স্বল্প সুদে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে বিদেশে অর্থ পাচার করেছে। এর ফলে সৃষ্ট তীব্র তারল্য সংকটে এখন সাধারণ ও সৎ ব্যবসায়ীরা উচ্চ সুদের হারের চাপে পিষ্ট হচ্ছেন।”

তিনি আরও অভিযোগ করেন, ২০১৯ সালের পর থেকে আমলাতন্ত্র ও বেসরকারি খাতের মধ্যে দূরত্ব বেড়েছে এবং অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা ও অদক্ষতা তৈরি করছে। এলডিসি উত্তরণের জন্য তিনি স্পষ্ট রোডম্যাপ ও প্রক্রিয়ার স্বয়ংক্রিয়করণের দাবি জানান।

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. নাসিরুদ্দিন আহমেদ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কর কর্মকর্তাদের হয়রানি থেকে বাঁচাতে ভারতে প্রচলিত ব্যবস্থার মতো ‘অনুমানভিত্তিক কর’ চালুর সুপারিশ করেন, যেখানে ব্যক্তি নিজেই আয়ের পরিমাণ ঘোষণা করে একটি নির্দিষ্ট হারে কর পরিশোধ করতে পারবেন।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top