নির্দেশনার পরও এসএমই ঋণ বিতরণে ধস

Web Photo Card May 17 2026 SME
ছবি: বিল্ড

জাতীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের প্রধান চালিকাশক্তি হলেও বাংলাদেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাত চরম নীতিগত অবহেলা এবং প্রশাসনিক জটিলতার শিকার হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কড়া নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও ব্যাংকগুলো এই খাতে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ঋণ দিচ্ছে না, যার ফলে চলতি বছরে এসএমই ঋণ বিতরণ আরও সংকুচিত হয়েছে। একই সাথে সরকারের শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা এবং বিশেষ শুল্ক ছাড় সংক্রান্ত ‘এসআরও-৩৮৪’ নীতিমালা সম্পর্কে দেশের ৮২ শতাংশের বেশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা সম্পূর্ণ অন্ধকারে রয়েছেন।

রোববার (১৭ মে) বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্ট (বিল্ড)-এর উদ্যোগে আয়োজিত ‘এসএমই প্রতিযোগিতা সক্ষমতা এবং রপ্তানি প্রবৃদ্ধি’ শীর্ষক এক জাতীয় কর্মশালায় খাতের এই নাজুক চিত্র ও সমীক্ষার তথ্য প্রকাশ করা হয়। রাজধানীর এই অনুষ্ঠানে শিল্প মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি), এসএমই ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ী নেতা ও উদ্যোক্তারা অংশ নেন।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে বিল্ড-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ফেরদৌস আরা বেগম বলেন, বাংলাদেশের বহু ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের রপ্তানি সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কেবল প্রক্রিয়াগত জটিলতা এবং নীতিগত সুযোগ-সুবিধার অভাবে তারা ছিটকে পড়ছেন।

সেমিনারে উপস্থাপিত বিল্ড-এর মূল সমীক্ষায় দেখা যায়, তৈরি পোশাক খাতের বাইরে হোম টেক্সটাইল, জুতা, হালকা প্রকৌশল (লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং), আসবাবপত্র, কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাদ্য এবং প্লাস্টিক প্যাকেজিং—এই ছয়টি অ-পোশাক খাতের ১০৭টি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ওপর জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে, মাত্র ১৩.১ শতাংশ প্রতিষ্ঠান কোনোমতে রপ্তানির সাথে যুক্ত হতে পেরেছে।

সবচেয়ে হতাশাজনক তথ্য হলো, জরিপকৃত প্রতিষ্ঠানগুলোর একটিও কখনো বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা ব্যবহার করতে পারেনি। এছাড়া সরকারের বিশেষ ছাড় সংক্রান্ত এসআরও-৩৮৪ নীতিমালার বিষয়ে মাত্র ১.৮৭ শতাংশ উদ্যোক্তা জানেন, যার ফলে সরকারের ভালো উদ্যোগগুলো মাঠপর্যায়ে কোনো কাজেই আসছে না।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক হোসনে আরা শিখা ব্যাংক ঋণের ক্ষেত্রে এসএমই খাতের বঞ্চনার চিত্র তুলে ধরে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য দেন। তিনি জানান, দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের মোট ঋণ পোর্টফোলিওর ২৫ শতাংশ বাধ্যতামূলকভাবে কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (সিএমএসএমই) খাতে দেওয়ার স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু এই নির্দেশনার পরও ব্যাংকগুলো ঋণ দিচ্ছে না। গত বছর মোট ঋণের মাত্র ১৮ শতাংশ এসএমই খাতে বিতরণ করা হয়েছিল, যা চলতি বছরে আরও নিচে নেমে গেছে।

হোসনে আরা শিখা আরও জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংক নারী উদ্যোক্তা ও স্টার্টআপদের জন্য মাত্র ৫ থেকে ৭ শতাংশ সুদে মোট ৬৭ হাজার ৯০০ কোটি টাকার বিশেষ পুনর্ব্যবহারযোগ্য তহবিল (রিন্যান্সিং ফান্ড) বরাদ্দ রেখেছে। এই বিশাল তহবিলের ১৫ শতাংশ এককভাবে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সংরক্ষিত থাকলেও ব্যাংকগুলোর অনীহা ও জটিলতার কারণে গত বছর নারীদের জন্য নির্ধারিত লক্ষ্যের মাত্র ৬.৭ শতাংশ অর্জিত হয়েছে। এই পরিস্থিতি দূর করতে এখন থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে বন্ড সুবিধা এবং এসআরও-৩৮৪ সংক্রান্ত সচেতনতা যুক্ত করা হবে বলে তিনি জানান।

উন্মুক্ত আলোচনায় কুমারখালীর শতবর্ষী হোম টেক্সটাইল ক্লাস্টারের প্রতিনিধিরা কাঁচা তুলার ওপর আমদানি শুল্ক কমানোর দাবি জানান। ভৈরব জুতা ক্লাস্টারের উদ্যোক্তারা কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং একটি সাধারণ সুবিধা কেন্দ্রের (সিএফসি) জরুরি প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। এছাড়া হালকা প্রকৌশল ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতের প্রতিনিধিরা চড়া ভ্যাট, অতিরিক্ত কমপ্লায়েন্স খরচ, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার এবং তীব্র বিদ্যুৎ সংকটের কারণে কারখানা চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব সুলতানা ইয়াসমিন বলেন, নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়নে একটি সমন্বিত ‘এসএমই ডেটাবেজ’ এবং ‘এসএমই ইনডেক্স’ তৈরি করা জরুরি। ইপিবির মহাপরিচালক-১ বেবি রানী কর্মকার জানান, অনেক ক্ষেত্রে ট্রেড লাইসেন্স ছাড়াও সম্ভাবনাময় নারী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আন্তর্জাতিক মেলায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দিচ্ছে ইপিবি। সেমিনারে এসএমই ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধিরা জানান, বর্তমানে এসএমই নীতিমালার সংশোধন কাজ চলছে, যেখানে উদ্যোক্তাদের এই যৌক্তিক সুপারিশগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top