বিশ্ববাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহ সংকট থেকে দেশের শিল্প খাত ও বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখতে বাংলাদেশকে ৩৫ কোটি মার্কিন ডলার অতিরিক্ত অর্থায়ন অনুমোদন করেছে বিশ্বব্যাংক। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামের তীব্র ওঠানামা এবং ভূ-রাজনৈতিক সংকটের মুখে দেশের সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই ঋণসহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংকের সদর দফতরে অনুষ্ঠিত কার্যনির্বাহী পরিচালক বোর্ডের সভায় গত ১৫ মে ২০২৬ তারিখে এই অতিরিক্ত তহবিল অনুমোদন করা হয়। সোমবার (১৮ মে) ঢাকায় অবস্থিত বিশ্বব্যাংকের আবাসিক কার্যালয় থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ঢাকা স্ট্রিট জার্নালকে (ডিএসজে) এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সামরিক সংঘাতের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বাজারে এক ধরনের অস্থিরতা ও সরবরাহ ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং পোশাক খাতসহ প্রধান প্রধান শিল্পকারখানার চাকা সচল রাখতে আমদানিকৃত এলএনজির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
দীর্ঘমেয়াদি এই ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কারণে বিশ্ববাজারে এলএনজির দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বা ডলার মজুত এবং সরকারি ব্যয়ের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে দেশের সার উৎপাদন ও জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মক ব্যাহত হবে এবং দেশের দরিদ্রতম পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে।
এই বাস্তবতায় বিশ্বব্যাংক তাদের চলমান ‘জ্বালানি খাত নিরাপত্তা সুদৃঢ়করণ প্রকল্প’-এর আওতায় এই অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অনুমোদিত এই নতুন অর্থায়নের মূল উদ্দেশ্য হলো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলাকে স্বল্পমেয়াদি চড়া মূল্যের ‘স্পট মার্কেট’ বা খোলা বাজার থেকে এলএনজি কেনার ক্ষতিকর নির্ভরতা কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির অধীনে সাশ্রয়ী মূল্যে গ্যাস আমদানির সুবিধা করে দেওয়া।
বিশ্বব্যাংকের এই অতিরিক্ত তহবিল পেট্রোবাংলার এলএনজি আমদানির মূল্য পরিশোধের সুরক্ষা কবচ হিসেবে কাজ করবে। এর ফলে দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী হবে, যা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বেসরকারি খাতের বিকাশ এবং সামগ্রিক সামষ্টিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (আইডিএ) পেমেন্ট গ্যারান্টি বা মূল্য পরিশোধের নিশ্চয়তা কাঠামোর আওতায় এই অর্থায়ন পরিচালিত হবে, যা স্ট্যান্ডবাই লেটার অব ক্রেডিট (এলসি) এবং স্বল্পমেয়াদি ঋণ লাইনের মাধ্যমে আমদানির পেমেন্ট সিকিউরিটি নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশে নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের ডিভিশন ডিরেক্টর জঁ পেসমে এই অর্থায়ন প্রসঙ্গে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এলএনজির দাম বাড়িয়ে দিয়েছে এবং সরবরাহ চেইন ব্যাহত করেছে। জ্বালানি আমদানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখতে বড় ধরনের রাজস্ব চাপের মুখে পড়েছে।
জ্বালানি খাতের এই সংকট নিরসনে এবং যুদ্ধের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। এই অর্থায়নের ফলে সাশ্রয়ী ও স্থিতিশীল গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত হবে, যা দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প খাতের কর্মতৎপরতা এবং নতুন কর্মসংস্থান ধরে রাখতে অত্যন্ত জরুরি।
বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং প্রকল্প প্রধান ওলায়িনকা এদেবীরি বলেন, তরল জ্বালানির চেয়ে গ্যাস অনেক বেশি সস্তা এবং কম কার্বন নিঃসরণকারী উৎস। নিরবচ্ছিন্ন এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে তা বাংলাদেশকে চড়া মূল্যের ফার্নেস অয়েল বা ডিজেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব সাশ্রয় করতে সাহায্য করবে।
উল্লেখ্য, বিশ্বব্যাংকের বোর্ড অব এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টরস এর আগে গত ১৮ জুন ২০২৫ তারিখে বাংলাদেশের জন্য মূল ৩৫ কোটি ডলারের ‘জ্বালানি নিরাপত্তা সুদৃঢ়করণ প্রকল্প’ অনুমোদন করেছিল। নতুন অনুমোদিত এই ৩৫ কোটি ডলার যুক্ত হওয়ায় প্রকল্পটির মোট আকার এখন দাঁড়িয়েছে ৭০ কোটি ডলারে। সুনির্দিষ্ট এই উন্নয়ন প্রকল্পটি আগামী ৩১ ডিসেম্বর ২০৩১ সালের মধ্যে পুরোপুরি বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।













