তিন লাখ কোটি টাকার রেকর্ড উন্নয়ন বাজেট অনুমোদন

Web Photo Card May 17 2026 ADP2026
ছবি: পরিকল্পনা মন্ত্রনালয়

বিগত সরকারের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্র সংস্কার এবং টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য রেকর্ড তিন লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (এনইসি)। সোমবার (১৮ মে) রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের সভায় এ অনুমোদন দেওয়া হয়।

প্রধানমন্ত্রী ও এনইসি চেয়ারপারসন তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় শুধুমাত্র অবকাঠামো নির্মাণ নয়, বরং প্রশাসনিক দক্ষতা, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সাথে আগামী পাঁচ বছরের জন্য ‘সংস্কার ও উন্নয়নের কৌশলগত আর্থিক পরিকাঠামো’ নীতিগতভাবে পাস করা হয়েছে।

এনইসি সভা শেষে পরিকল্পনা কমিশন মিলনায়তনে আয়োজিত আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অস্থিরতা, অদক্ষতা ও দুর্বল বিনিয়োগ পরিবেশ থেকে দেশকে পুনরুদ্ধার করতে বড় বিনিয়োগের কোনো বিকল্প নেই। সেই লক্ষ্য সামনে রেখেই এই উচ্চাভিলাষী এডিপি প্রস্তাব করা হয়েছে। অতীতের সরকারের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতিতে বড় অঙ্কের নতুন বিনিয়োগ লাগবে, সে জন্যই এই বড় এডিপি নেওয়া হয়েছে। সরকার ধরে নিয়েছে যে একটি নির্বাচিত সরকারের বাস্তবায়ন সক্ষমতা, জবাবদিহি ও প্রশাসনিক দক্ষতা অনেক বেশি থাকবে এবং সেই আত্মবিশ্বাস থেকেই এই বড় উন্নয়ন বাজেট নেওয়া হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের কার্যপত্র অনুযায়ী, অনুমোদিত মূল এডিপির আকার ধরা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে আসবে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা ও করপোরেশনের নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়িত প্রকল্পে আরও ৮ হাজার ৯২৪ কোটি টাকা যুক্ত হলে মোট উন্নয়ন ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়াবে ৩ লাখ ৮ হাজার ৯২৪ কোটি টাকা।

এই বিশাল বাজেটের আওতায় মোট ১ হাজার ১২১টি উন্নয়ন প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে ৯৪৯টি বিনিয়োগ প্রকল্প, ১০৭টি কারিগরি সহায়তা প্রকল্প এবং ৪৩টি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার নিজস্ব অর্থায়নের প্রকল্প রয়েছে।

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী জানান, অতীতে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ নিয়ে প্রভাব খাটানো, অযোগ্য ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়া এবং দুর্নীতির কারণে অনেক প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়নি। এ কারণে এখন থেকে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগে সুনির্দিষ্ট নিয়মকানুন ও কড়া মানদণ্ড অনুসরণ করা হবে। প্রয়োজনীয় কারিগরি ও প্রশাসনিক দক্ষতা না থাকলে কাউকে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হবে না এবং সময়মতো প্রকল্প শেষ না হলে দায়ও নির্ধারণ করা হবে। প্রতিটি প্রকল্প শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিবিড় পর্যবেক্ষণের আওতায় রাখতে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে আলাদা ‘ডিজিটাল তথ্যফলক’ থাকবে, যার মাধ্যমে ধীরগতি বা অনিয়ম দেখলে তাৎক্ষণিকভাবে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

খাতভিত্তিক বরাদ্দের ক্ষেত্রে বরাবরের মতো এবারও সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পেয়েছে পরিবহন ও যোগাযোগ খাত, যেখানে ৫০ হাজার ৯২ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা মোট এডিপির ১৬.৭০ শতাংশ। এছাড়া শিক্ষা খাতে ৪৭ হাজার ৫৯১ কোটি টাকা, স্বাস্থ্য খাতে ৩৫ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ৩২ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা এবং গৃহায়ন ও কমিউনিটি সুবিধা খাতে ২০ হাজার ৩৬১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, মন্ত্রণালয় ও বিভাগভিত্তিক বরাদ্দের দৌড়ে সবচেয়ে বেশি অর্থ পেয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ, যার পরিমাণ ৩৩ হাজার ৩৭৫ কোটি টাকা এবং দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩০ হাজার ৭৪১ কোটি টাকা। এছাড়া স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ ২৬ হাজার ৮০৬ কোটি টাকা, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিভাগ ২০ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা এবং প্রাথমিক ও গনশিক্ষা মন্ত্রনালয়ে ১৯ হাজার ৪৪১ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বড় বরাদ্দের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে চায় এবং তরুণরা যেন কারিগরি দক্ষতা অর্জন করে দেশে ও বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়, সেই পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে।

দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় সামাজিক উন্নয়ন সহায়তা খাতে ১৭ হাজার কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যার মধ্যে ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা খরচ করা হবে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘পরিবার কার্ড’ কর্মসূচির জন্য। কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতায় ‘কৃষক কার্ড’-এর জন্য ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা এবং ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে মসজিদ ও উপাসনালয়ের দায়িত্ব পালনকারীদের সম্মানী বাবদ ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

তবে এবারের উন্নয়ন কর্মসূচির সবচেয়ে আলোচিত দিক হচ্ছে থোক বরাদ্দের ব্যাপক সম্প্রসারণ। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিশেষ উন্নয়ন সহায়তা এবং সামাজিক উন্নয়ন সহায়তা মিলিয়ে এবার প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যার বিপরীতে সরাসরি প্রকল্পভিত্তিক বরাদ্দ রয়েছে প্রায় ১ লাখ ৮১ হাজার ৭১১ কোটি টাকা। কার্যপত্র অনুযায়ী, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের চলমান প্রকল্পে বরাদ্দ যেখানে ৬ হাজার ৮ কোটি টাকা, সেখানে থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২০ হাজার ৮০০ কোটি টাকা।

একইভাবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের চলমান প্রকল্পে ৫ হাজার ৪৮ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও থোক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১৪ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগেও ৩ হাজার ৭৯ কোটি টাকার থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় প্রায় ১ হাজার ৩০০ প্রকল্প চলমান ছিল উল্লেখ করে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এগুলোর অনেকগুলোই ছিল অগ্রাধিকারহীন এবং পলিটিক্যাল বা অন্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। যেখানে দুর্নীতি ও অদক্ষতার কারণে প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে, কিন্তু জনগণ সুফল পায়নি। বর্তমানে সব প্রকল্প পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে এবং যেগুলো জনস্বার্থে প্রয়োজনীয় বা বাস্তবায়নযোগ্য নয়, সেগুলো পুরোপুরি বাদ দেওয়া হবে। শুধুমাত্র অর্থ ব্যয় করার জন্য কোনো প্রকল্প চালিয়ে যাওয়া হবে না।

এডিপিতে থোক বরাদ্দ রাখার বিষয়ে তিনি ব্যাখ্যা দেন যে, অনেক প্রকল্প বাদ যাবে এবং নতুন প্রকল্প নেওয়া হবে, যার কারণে এই সাময়িক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সরকার কোনো ‘কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি’ চায় না।

এবারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিকে মূলত পাঁচটি প্রধান কৌশলগত স্তম্ভে বিন্যস্ত করা হয়েছে। প্রথম স্তম্ভ ‘রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংস্কার’-এর আওতায় বিচার ও আইনি সেবা সম্প্রসারণ, প্রশাসনিক কার্যক্রম সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে রূপান্তর এবং বহু-বছর মেয়াদি সরকারি বিনিয়োগ কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় স্তম্ভ ‘বৈষম্যহীন আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন’-এ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে বড় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

তৃতীয় স্তম্ভ ‘ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধার’-এর মূল লক্ষ্য হলো জ্বালানি নিরাপত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ এবং শিল্পায়ন। চতুর্থ স্তম্ভ ‘অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়ন’-এর আওতায় উত্তরাঞ্চল, উপকূলীয় এলাকা, পার্বত্য অঞ্চল ও বন্দরকেন্দ্রিক উন্নয়ন কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে এবং পঞ্চম স্তম্ভ ‘সামাজিক সংহতি’-র মাধ্যমে সংস্কৃতির বিকাশ ও ক্রীড়া অবকাঠামো সম্প্রসারণের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

বিশাল উন্নয়ন বাজেট ঘোষণা করা হলেও এর বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক বিশ্লেষকেরা। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত প্রথম নয় মাসে উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের হার হয়েছে মাত্র ৩৬.১৯ শতাংশ, যেখানে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নের বাস্তবায়ন হার ৩৩ শতাংশের সামান্য বেশি।

রাজস্ব আদায়ের বিষয়ে মন্ত্রী আমির খসুর বলেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংস্কারের মাধ্যমে করের আওতায় নতুন মানুষকে আনা হবে। সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এবং পরিকল্পনা কমিশনের কার্যক্রম বিভাগের সদস্য এস এম শাকিল আখতার উপস্থিত ছিলেন।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top