চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম কয়েক মাস ইতিবাচক ধারায় থাকলেও সপ্তম ও অষ্টম মাসে এসে জাতীয় সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে বড় ধরনের ধস নেমেছে। গত ফেব্রুয়ারি ও মার্চ—টানা দুই মাস ধরে সঞ্চয়পত্র নতুন বিক্রির চেয়ে গ্রাহকদের আগের আসল ও সুদ পরিশোধের পরিমাণ অনেক বেড়ে গেছে, যার ফলে নিট বিক্রি ঋণাত্মক বা নেতিবাচক ধারায় চলে এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এই উদ্বেগজনক তথ্য জানা গেছে। মূলত উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সঞ্চয়পত্রের সুদের হার পুনর্নির্ধারণ এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নানামুখী কড়াকড়ির কারণে সাধারণ মানুষের সঞ্চয় করার ক্ষমতা কমে যাওয়াই এই টানা নেতিবাচক ধারার প্রধান কারণ বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের নবম মাস মার্চে সঞ্চয়পত্র নিট বিক্রি ২ হাজার ১৩৫ কোটি ৮ লাখ টাকা ঋণাত্মক ধারায় রয়েছে। এর অর্থ হলো, আলোচ্য মাসে নতুন সঞ্চয়পত্র বিক্রির মাধ্যমে যে টাকা সরকারের তহবিলে এসেছে, তার চেয়ে আগের কেনা সঞ্চয়পত্রের আসল ও সুদ বাবদ গ্রাহকদের ২ হাজার ১৩৫ কোটি ৮ লাখ টাকা বেশি পরিশোধ করতে হয়েছে। অথচ আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়েও সঞ্চয়পত্র বিক্রি ইতিবাচক ধারায় ছিল এবং ওই মাসে বিক্রির পরিমাণ পরিশোধের চেয়ে ৮০ কোটি ৫৫ লাখ টাকা বেশি ছিল।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য মতে, মার্চ মাসের এই ধাক্কার আগে চলতি অর্থবছরের অষ্টম মাস ফেব্রুয়ারিতেও বিক্রির চেয়ে আগের আসল ও সুদ বাবদ ১ হাজার ১৬৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকা বেশি পরিশোধ করতে হয়েছিল। তবে এর আগের মাস অর্থাৎ জানুয়ারি পর্যন্ত পরিস্থিতি অনুকূলে ছিল, যেখানে জানুয়ারি মাসে পরিশোধের চেয়ে সঞ্চয়পত্র বিক্রি বেশি হয়েছিল ১ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা।
একক মাস হিসেবে ফেব্রুয়ারি ও মার্চের এই নেতিবাচক ধারার প্রভাবে চলতি অর্থবছরের নয় মাসের (জুলাই-মার্চ) সামগ্রিক চিত্রও ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন দাম বৃদ্ধির কারণে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জীবনযাত্রার ব্যয় চরমভাবে বেড়েছে। ফলে মানুষের নতুন করে সঞ্চয় করার মতো উদ্বৃত্ত টাকা যেমন থাকছে না, তেমনি অনেকে জীবনযাপনের খরচ মেটাতে আগের কেনা সঞ্চয়পত্র মেয়াদ ফুরানোর আগেই ভেঙে ফেলতে বাধ্য হচ্ছেন।
আর্থিক খাতের কড়াকড়িও বিক্রি কমার পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে সঞ্চয়পত্র কিনতে টিআইএন (TIN) বাধ্যতামূলক করা, ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে লেনদেন এবং ৫ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আয়করের রিটার্ন জমার রসিদ বাধ্যতামূলক করার কারণে অনেক সাধারণ বিনিয়োগকারী এই খাত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। এর ওপর সুদের হারের স্তরভিত্তিক হ্রাস নীতি কার্যকর থাকায় আগের মতো আকর্ষণীয় মুনাফা না পেয়ে অনেকেই বিকল্প বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকছেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে সঞ্চয়পত্র বিক্রি নেতিবাচক পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে নতুন বিক্রির চেয়ে আগের আসল-সুদ বাবদ ২ হাজার ৬৮৯ কোটি ৮৫ লাখ টাকা বেশি পরিশোধ করতে হয়েছে। অবশ্য আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে সঞ্চয়পত্র বিক্রির এই ঘাটতি আরও অনেক বেশি ছিল, যার পরিমাণ ছিল ৮ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত কয়েক বছর ধরেই সরকারের এই অভ্যন্তরীণ ঋণ উৎসটি ধারাবাহিকভাবে সংকুচিত হচ্ছে। পুরো ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ১২ মাসে (জুলাই-জুন) সঞ্চয়পত্র নিট বিক্রি ঋণাত্মক ধারায় ছিল এবং সে সময় বিক্রির চেয়ে ৬ হাজার ৬৩ কোটি টাকা বেশি পরিশোধ করতে হয়েছিল। তারও আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের পুরো ১২ মাসে সঞ্চয়পত্র বিক্রির চেয়ে আগের সুদ ও আসল বাবদ ২১ হাজার ১২৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা বেশি পরিশোধ করতে হয়েছিল সরকারকে। সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিক চাপ ও নীতিগত কড়াকড়ি দূর না হলে সঞ্চয়পত্রের এই মন্দা দশা সহজে কাটবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।













