বিগত সরকারের আমলে পুরো বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে গুটিকয়েক বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থে ইজারা দিয়ে দেশে একচ্ছত্র অলিগার্কি বা কতিপয়তন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধি না করে সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর একটি জ্বালানি খাত গড়ে তোলার মধ্য দিয়েই মূলত এই ক্ষতিকর অলিগার্কদের দুষ্টচক্রের জন্ম হয়।
এই চক্রের তৈরি করা ইনডেমনিটি বা বিশেষ বিধানের সুযোগ নিয়ে জনগণের করের টাকা ভর্তুকি হিসেবে লুটে নেওয়া হয়েছে এবং দেশে এক ধরনের ‘বি-শিল্পায়ন’ ঘটানো হয়েছে। এই কাঠামোগত বিষক্রিয়া বা ‘পয়জনাস ডেডলি স্নেক’ পুরো দেশের অর্থনীতিকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে, যা থেকে মুক্ত না হলে খাতের রক্তক্ষরণ বন্ধ করা সম্ভব নয়।
রোববার (১৭ মে) রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এবং অনলাইন সংবাদ মাধ্যম ‘ঢাকা স্ট্রিম’-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘আসন্ন বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির সমীকরণ’ শীর্ষক এক প্রাক-বাজেট সংলাপে বিদ্যুৎ খাতে অলিগার্কদের এই উত্থান ও দুষ্টচক্রের জন্মের আদ্যোপান্ত উঠে আসে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এই চক্রের স্বরূপ উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এবং মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংস্থাটির গবেষক খালিদ মাহমুদ।
সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, অতীতে জ্বালানি খাত কেবল গুটিকয়েক অলিগার্ককে মোটাতাজা করেছে, যেখানে দেশের শিল্পমালিক ও সাধারণ ভোক্তারা তাদের কাছে স্রেফ খেলনার পাত্রে পরিণত হয়েছিলেন। কয়েকটি কোম্পানি পুরো জ্বালানি খাতকে এমনভাবে বেঁধে ফেলেছিল যে তা থেকে বের হওয়া যাচ্ছিল না।
“বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা এবং তার প্রকৃত ব্যবহারের মধ্যে বিস্তর ফারাক তৈরি করে ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ বা সক্ষমতার মাশুল হিসেবে জনগণের বিপুল পরিমাণ সম্পদের অপচয় করা হয়েছে। একই সাথে বিগত সময়ে করা অস্বচ্ছ চুক্তিগুলোকে আইনি সুরক্ষা বা দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছিল, যা প্রকৃত ন্যায়বিচার ও জাতীয় স্বার্থের সম্পূর্ণ পরিপন্থী ছিল।”
উপদেষ্টা স্পষ্ট জানান, অলিগার্কদের এই বিষধর চক্র ও আমদানিনির্ভরতার বেড়াজাল ভেঙে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি ট্রিলিয়ন ডলারে পরিণত করতে আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে এবং নীতি নির্ধারণীতে জ্বালানি খাতের আমূল সংস্কারে সুনির্দিষ্ট ৫টি মাইলফলক বা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথমত, জ্বালানি মিশ্রণে আমূল পরিবর্তন এনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অনুপাত উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হবে। দ্বিতীয়ত, সাধারণ গৃহস্থালি ভোক্তা, নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের আয়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখে এবং শিল্প খাতের জন্য পৃথক যৌক্তিক ও বৈষম্যহীন মূল্য নির্ধারণ কাঠামো তৈরি করা হবে।
তৃতীয়ত, সোলার প্যানেলসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আমদানির ওপর একচেটিয়া নির্ভরতা কমিয়ে তা দেশেই উৎপাদনের জন্য বিশেষ প্রণোদনা ও রাজস্ব সুবিধা দেওয়া হবে। চতুর্থত, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে বাপেক্সের মতো দেশীয় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হবে। পঞ্চমত, যেকোনো বৈশ্বিক সংকট মোকাবেলালায় সার বা খাদ্যের মতো জ্বালানির ক্ষেত্রেও একটি ন্যূনতম আপৎকালীন মজুদ বা ‘বেঞ্চমার্ক’ নির্ধারণ করা হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর ডাক,切换 টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি) ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিই হচ্ছে পৃথিবীর ভবিষ্যৎ। তবে বাংলাদেশে এটি জনপ্রিয় করতে হলে আমাদের সবার আগে গ্রিড ও বিদ্যুৎ পরিকাধামো এবং চার্জিং স্টেশন সুবিধা শক্তিশালী করতে হবে। সরকার ইতিমধ্যে বৈদ্যুতিক বাসের ওপর আমদানি শুল্ক কমিয়েছে এবং আগামী বাজেটে লিথিয়াম ব্যাটারি, সৌরবিদ্যুৎ ও বৈদ্যুতিক যানবাহনকে একটি সমন্বিত এবং একক নীতি কাঠামোর আওতায় এনে বড় ধরনের শুল্ক ছাড়ের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) জীবাশ্ম জ্বালানির উন্নয়নে বিপুল পরিমাণ বরাদ্দ দেওয়া হলেও পরিবেশবান্ধব জ্বালানিকে সবসময় অবহেলা করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরেও বিদ্যুৎ খাতের ৪২টি উন্নয়ন প্রকল্পের মধ্যে মাত্র ৩টি প্রকল্প নবায়নযোগ্য জ্বালানির, যা মোট বরাদ্দের মাত্র ৪.৬ শতাংশ।
তিনি বলেন, বিগত এক দশকে মুখে বড় বড় লক্ষ্যমাত্রার কথা বলা হলেও বাজেটে বিদ্যুৎ খাতের বরাদ্দের ৪ শতাংশের বেশি কোনো দিনই এই উদীয়মান খাতে দেওয়া হয়নি। তিনি সরকারকে আসন্ন বাজেটে এই বরাদ্দ আর না কমিয়ে বরং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দেওয়ার পাশাপাশি কয়লাভিত্তিক ক্ষতিকর বিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে পুরোপুরি সরে আসার আহ্বান জানান।
উপস্থিত বিশেষজ্ঞরা জানান, বর্তমানে বাংলাদেশে মাত্র ১,৭৪৫ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। এর অন্যতম প্রধান অন্তরায় হচ্ছে এই খাতের যন্ত্রপাতির ওপর চড়া আমদানি শুল্ক। বর্তমানে সৌর সরঞ্জামের ওপর ২৮ থেকে ৩৪ শতাংশ এবং ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেমের ওপর প্রায় ৬২ শতাংশ পর্যন্ত উচ্চ শুল্ক ও কর চাপানো রয়েছে।
ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির এনার্জি রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরী বলেন, বিদ্যুৎ খাতে প্রতি বছর সরকার যে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি অপচয় করে, তার সঠিক ব্যবহার করা গেলে দেশেই ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব।
সেমিনারে অন্যান্যের মধ্যে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য মনজুর হোসেন, ইডকলের নির্বাহী পরিচালক আলমগীর মোর্শেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা এবং বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম উপস্থিত থেকে তাঁদের মতামত তুলে ধরেন।













