বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী ঋণমান পূর্বাভাস ‘স্থিতিশীল’ থেকে কমিয়ে ‘নেতিবাচ ‘ করেছে আন্তর্জাতিক ঋণমান সংস্থা ফিচ রেটিংস। ঋণমান অবনমনের অর্থ হলো—বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা এখন খাদের কিনারায়। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আর অভ্যন্তরীণ সংস্কারে সরকারের রহস্যময় অনীহার ফলে ডলারের লাগামহীন দাম, আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতি এবং বিনিয়োগ স্থবিরতার এক দীর্ঘস্থায়ী চক্রে আটকা পড়তে যাচ্ছে দেশ।
আজ বুধবার (১৩ মে) হংকং থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানায়, বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী ইস্যুআর ডিফল্ট রেটিং (আইডিআর) ‘বি প্লাস’ রাখা হলেও এর ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস এখন শঙ্কার মুখে।
ফিচ রেটিংসের এই নেতিবাচক পূর্বাভাস মূলত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ও দেশের মান-মর্যাদার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে। সহজ কথায়, একটি দেশ যখন তার ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে বিদেশি সংস্থাগুলোর কাছে আস্থার সংকটে পড়ে, তখনই এ ধরনের রেটিং অবনমন করা হয়। ফিচ জানিয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা এবং সামনের দিনগুলোতে যে ধরনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, তাতে দেশটি আর আগের মতো নিরাপদ অবস্থানে নেই।
এই রেটিং অবনমনের একটি বড় কারণ হলো মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি। আমাদের দেশের মোট রেমিট্যান্সের অর্ধেকই আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে, যা দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। এছাড়া জ্বালানি তেলের বড় অংশও ওখান থেকে আসে। ফিচ মনে করছে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বাড়লে বা দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স আসা কমে যেতে পারে এবং জ্বালানি তেলের দাম কয়েক গুণ বেড়ে গিয়ে সাধারণ মানুষের পকেট কাটবে।
আরেকটি বড় দুশ্চিন্তার বিষয় হলো সরকারের সংস্কার কার্যক্রম নিয়ে অনিশ্চয়তা। ফিচ লক্ষ্য করেছে যে, বর্তমান প্রশাসন ব্যাংকিং খাতের সুশাসন ফেরানো কিংবা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার মতো যেসব বড় সংস্কারের কথা বলেছিল, সেগুলো বাস্তবায়নে তারা এখন দোটানায় রয়েছে। বিদেশি সংস্থাগুলো যখন দেখে একটি দেশ তার নিজের অভ্যন্তরীণ সমস্যা বা অনিয়ম দূর করতে অনীহা দেখাচ্ছে, তখন তারা সেই দেশ সম্পর্কে নেতিবাচক বার্তা দেয়।
সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে আশঙ্কার খবর হলো মূল্যস্ফীতি ও প্রবৃদ্ধি নিয়ে পূর্বাভাস। ফিচ বলছে, ২০২৬ ও ২০২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে ৩.৫ শতাংশের ঘরে নামতে পারে। এর মানে হলো দেশে কর্মসংস্থান কম তৈরি হবে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা দেখা দেবে। গত এপ্রিল মাসে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ফলে বাজারে জিনিসপত্রের দাম আরও বাড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা মূল্যস্ফীতিকে ৯ শতাংশের ওপরে আটকে রাখবে।
ব্যাংকিং খাতের অবস্থাকে ফিচ অনেকটা ‘ভয়াবহ’ হিসেবে চিত্রিত করেছে। দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের হার ৩০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। ব্যাংকগুলোতে যখন সাধারণ মানুষের জমানো টাকা এভাবে খেলাপিদের পকেটে চলে যায়, তখন পুরো আর্থিক কাঠামো ভেঙে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। ফিচ সতর্ক করেছে যে, আইএমএফের ঋণ কর্মসূচি বা আন্তর্জাতিক সহায়তা যদি কোনো কারণে বিঘ্নিত হয়, তবে ডলারের সংকট আরও চরম আকার ধারণ করবে।
এই রেটিং অবনমন সাধারণ মানুষের জন্য কেন উদ্বেগের? কারণ, এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। বিদেশ থেকে যখন সরকার বা বড় কোনো কোম্পানি ঋণ নিতে যাবে, তখন তাদের অনেক বেশি সুদ গুনতে হবে। আর ঋণের উচ্চ সুদ মেটাতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত জনগণের ওপরই ট্যাক্সের বোঝা চাপবে। এছাড়া বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে নতুন কারখানা বা ব্যবসা খুলতে ভয় পাবেন, যার ফলে শিক্ষিত বেকারদের চাকরির সুযোগ আরও কমে যাবে।
তৈরি পোশাক খাতের জন্য এই খবরটি মোটেও ভালো নয়। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পোশাকের চাহিদা কমছে এবং উৎপাদন খরচ বাড়ছে। একই সাথে রাজনৈতিক বা বৈশ্বিক কারণে পোশাকের অর্ডার অন্য দেশে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ফিচ মনে করে, যদি দ্রুত বড় কোনো অর্থনৈতিক সংস্কার করা না হয় এবং রিজার্ভের পতন ঠেকানো না যায়, তবে সামনের দিনগুলোতে বাংলাদেশের জন্য বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধ করাই কঠিন হয়ে পড়বে।
এত নেতিবাচক খবরের মধ্যেও ফিচ বাংলাদেশের রেটিং ‘বি প্লাস’ বজায় রেখেছে কারণ দেশের সরকারি ঋণের পরিমাণ এখনও জিডিপির ৩৮ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ, যা অনেক সমকক্ষ দেশের তুলনায় ভালো। এছাড়া দ্বিপাক্ষিক ও বহুজাতিক সংস্থাগুলো থেকে এখনো সহজ শর্তে ঋণ পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে সংস্থাটি সতর্ক করেছে যে, যদি আইএমএফ প্রোগ্রামের ধারাবাহিকতা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয় বা রিজার্ভের পতন ঠেকানো না যায়, তবে পরিস্থিতির আরও অবনতি হবে।









