পুঁজিবাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আমানত নিয়ে ছিনিমিনি খেলা এবং দীর্ঘ সময় ধরে বেআইনী বিনিয়োগ আঁকড়ে রাখার দায়ে ভ্যানগার্ড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। ভ্যানগার্ড এএমএল রূপালী ব্যাংক ব্যালেন্সড ফান্ডের অর্থ আত্মসাৎ ও বিধি-বহির্ভূত বিনিয়োগের প্রমাণ মেলায় কোম্পানিটিকে বড় অংকের জরিমানার পাশাপাশি বেআইনীভাবে বিনিয়োগকৃত অর্থ লভ্যাংশসহ ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বুধবার (৬ মে) বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ-এর নেতৃত্বে গঠিত কমিশন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, নির্ধারিত সময়ে বেআইনী বিনিয়োগ ফিরিয়ে না আনলে সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ভ্যানগার্ডকে প্রায় ২৩ কোটি টাকা জরিমানা দিতে হবে।
তদন্তে উঠে এসেছে যে, ভ্যানগার্ড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট ২০১৩ সালে সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘন করে বেঙ্গল পলি অ্যান্ড পেপার স্যাক লিমিটেডের শেয়ারে ১.৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে। অতালিকাভুক্ত এ কোম্পানির ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের শেয়ার ১৫ টাকা প্রিমিয়ামে কেনা হয়। দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে এই বেআইনী বিনিয়োগ অব্যাহত রেখে বিনিয়োগকারীদের প্রাপ্য মুনাফা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।
ফান্ডের বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় কমিশন আদেশ জারি করেছে যে, আগামী ৩০ দিনের মধ্যে ভ্যানগার্ডকে ওই ফান্ডে ৫.৭৪ কোটি টাকা ফেরত দিতে হবে। নির্ধারিত সময়ে এই অর্থ জমা দিতে ব্যর্থ হলে ভ্যানগার্ড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টকে ৬.৭৫ কোটি টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হতে হবে।
অনিয়মের এখানেই শেষ নয়; ২০১৭ সালেও একই ফান্ড থেকে এএফসি হেলথ লিমিটেডের ১০ টাকার শেয়ারে ১২.৫০ টাকা দরে মোট ৬ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে কোম্পানিটি, যা ছিল সিকিউরিটিজ আইনের সরাসরি লঙ্ঘন। কমিশন এই বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ভ্যানগার্ডকে আগামী ৩০ দিনের মধ্যে ১৪.৮৫ কোটি টাকা ফান্ডে ফেরত দেওয়ার চরমপত্র দিয়েছে। এই বিপুল অংকের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হলে সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানিটির ওপর ১৬ কোটি টাকা জরিমানার খড়্গ নামবে। উভয় ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পরবর্তী ৭ দিনের মধ্যে অভিযুক্ত কোম্পানিকে নিজস্ব দায় থেকে এই জরিমানা পরিশোধ করতে হবে।
বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় এই মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ট্রাস্টি প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)-কেও শাস্তির আওতায় এনেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। বিএসইসি মনে করে, বছরের পর বছর ধরে চলা এই বেআইনী বিনিয়োগের তদারকি ও বাধা প্রদানে আইসিবি চরম অবহেলা প্রদর্শন করেছে। ট্রাস্টি হিসেবে যথাযথ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হওয়ার দায়ে আইসিবি-কে ১৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এটি মূলত ট্রাস্টি প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার একটি উদ্যোগ।
পাশাপাশি এই বিশাল অনিয়মের পেছনে ফান্ডের নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান মালেক সিদ্দিকী ওয়ালী অ্যান্ড কোং চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস-এর রহস্যজনক ভূমিকাও সামনে এসেছে। অডিট প্রতিষ্ঠানটি সংশ্লিষ্ট ফান্ডের ৯৯ শতাংশ প্রভিশন রাখার বিষয়টি তাদের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে যথাযথভাবে স্পষ্ট করেনি, যা তথ্যের স্বচ্ছতা বিনষ্ট করেছে। এই অপরাধে অডিট ফার্মটির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিষয়টি ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলে (এফআরসি) পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন।
বিনিয়োগের অর্থ ও জরিমানা পরিশোধে বিলম্ব হলে ভ্যানগার্ডের ওপর আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে বিএসইসি। নির্ধারিত সময়ের পর জরিমানা পরিশোধে ব্যর্থ হলে প্রতিদিনের জন্য অতিরিক্ত ১০ হাজার টাকা হারে অর্থদণ্ড কার্যকর হবে।













