বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা এবং মানসম্মত বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে বিদ্যমান ব্যবসায়িক পরিবেশের আমূল সংস্কার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন নীতিনির্ধারক ও ব্যবসায়ী নেতারা। বুধবার (২৯ এপ্রিল) রাজধানীর মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) এবং পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ যৌথভাবে ‘বিনিয়োগ জলবায়ুর উন্নয়ন’ শীর্ষক এক উচ্চপর্যায়ের সংলাপে এমন দাবি জানিয়েছেন তারা।
অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনের সহায়তায় আয়োজিত এই সংলাপে নতুন সরকারের সংস্কার এজেন্ডা এবং আসন্ন জাতীয় বাজেটে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোর বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পায় । সংলাপের মূল উপস্থাপনায় পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও সিইও ড. এম. মাসরুর রিয়াজ বলেন, বেসরকারি খাতের বিকাশ, প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরি এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে সময়োপযোগী সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই ।
এমসিসিআই-এর মহাসচিব ও সিইও ফারুক আহমেদ তাঁর স্বাগত বক্তব্যে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য একটি শক্তিশালী বিনিয়োগ বান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন । সংলাপে ব্যবসায়ী নেতারা উল্লেখ করেন যে, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বিনিয়োগকারীরা নীতিনির্ধারণী নিশ্চয়তা ও ব্যবসা করার সহজলভ্যতাকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন ।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান সম্মানীয় অতিথির বক্তব্যে শিল্প খাতের প্রধান সংকট হিসেবে জ্বালানি সমস্যার কথা তুলে ধরেন । তিনি স্পষ্ট জানান, নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্মত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে বাংলাদেশের পক্ষে উচ্চমূল্যের শিল্পে প্রবেশ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে । তাঁর মতে, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে টেকসই বিনিয়োগ আকর্ষণ করা সম্ভব নয় ।
ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিমিটেডের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও) জিনিয়া হক বিনিয়োগকারীদের অগ্রাধিকারের বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলেন, তারা মূলত গতি, স্বচ্ছতা এবং বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয় আশা করেন । তিনি আরও গুরুত্বারোপ করেন যে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে হলে নীতিগুলোকে ব্যক্তি-নির্ভর করার পরিবর্তে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে রূপান্তর করা জরুরি । এটি করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশে বিনিয়োগের ধারা স্থিতিশীল থাকবে বলে তিনি মনে করেন ।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন চেম্বার অফ কমার্স ইন বাংলাদেশ (ইউরোচ্যাম)-এর চেয়ারপারসন নুরিয়া লোপেজ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) ওপর বিশেষ জোর দেন । তিনি বলেন, এফটিএ নিয়ে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি এবং নির্ভরযোগ্য রপ্তানি সুবিধা নিশ্চিত করা না গেলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে আসতে দ্বিধাগ্রস্ত থাকবেন । এছাড়া তিনি শুল্ক ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, নীতির ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে স্বচ্ছ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন ।
আইন বিশেষজ্ঞ মারগুব কবির বাণিজ্যিক বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিদ্যমান আইন সংস্কারের দাবি জানান । তিনি উল্লেখ করেন, ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করতে হলে সেকেলে বা পুরনো পদ্ধতিগত আইনগুলো সংশোধন করে সেগুলোকে আধুনিক ও সময়োপযোগী করা প্রয়োজন । আইনের জটিলতা ও আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে বলে তিনি মনে করেন ।
সংলাপের প্যানেল আলোচনায় বক্তারা ব্যবসায়িক প্রতিবন্ধকতা হিসেবে নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থার জটিলতাকে চিহ্নিত করেন । তারা এই জটিলতা নিরসনে বাস্তবসম্মত সুপারিশ পেশ করেন যা আসন্ন বাজেটে প্রতিফলিত হওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন ।
অংশগ্রহণকারীরা একমত হন যে, কেবল আলোচনা নয় বরং এগুলোকে কার্যকরী নীতিতে রূপান্তর করতে হবে যাতে বিনিয়োগকারীদের মনে আস্থা তৈরি হয় । অনুষ্ঠানের সমাপনী বক্তব্যে সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে সমন্বিত সংস্কার ও টেকসই অংশীদারত্বের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয় । বলা হয় যে, বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করতে হলে ব্যবসায়িক পরিবেশের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে হবে । সবশেষে ফারুক আহমেদ সংলাপে অংশগ্রহণকারী এবং সহায়তাকারী পক্ষগুলোকে ধন্যবাদ জানিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করেন ।













