রপ্তানি বাণিজ্যে বৈচিত্র্য আনতে এবং একক খাতের ওপর নির্ভরতা কমাতে তৈরি পোশাক শিল্পের মতো অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাতকেও সমপর্যায়ের সুযোগ-সুবিধা প্রদানের ঘোষণা দিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বুধবার রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও এফবিসিসিআই আয়োজিত বাজেট পরামর্শক কমিটির সভায় তিনি এই বড় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের গার্মেন্টস খাত বৈশ্বিক বাজারে দারুণ সফল হলেও স্বর্ণ বা হীরা শিল্পের মতো অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাতগুলো অনেক পিছিয়ে রয়েছে। এখন থেকে যেকোনো রপ্তানি খাত যদি যৌক্তিক প্রস্তাব দেয়, তবে তাদের বন্ডেড ওয়্যারহাউস এবং ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি সুবিধাসহ পোশাক শিল্পের সমান সব সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হবে।
অনিয়ম বা অপব্যবহারের আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে মন্ত্রী স্পষ্ট জানান, “চুরির ভয়ে আমরা সম্ভাবনাময় খাতগুলোকে আটকে রাখব না; চুরির সমাধান আলাদাভাবে হবে, কিন্তু ব্যবসার সুযোগ সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।” তিনি বিশ্বাস করেন, সকল রপ্তানি খাতে সমান সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে দেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয় বর্তমানের চেয়ে বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
ব্যবসায়ীদের আশ্বস্ত করে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বর্তমান সরকার ‘পৃষ্ঠপোষকতার অর্থনীতি’ নয়, বরং ‘অর্থনীতির গণতান্ত্রিকীকরণে’ বিশ্বাসী, যেখানে সকল ব্যবসায়ী সমান সুযোগ পাবেন। তিনি বন্দরগুলোতে অহেতুক ব্যয় বৃদ্ধি এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে ব্যবসায়ীদের বাধার জায়গাগুলো চিহ্নিত করে জানানোর আহ্বান জানান।
আগামী অর্থবছরের বাজেট সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী ইঙ্গিত দেন যে, ভঙ্গুর অর্থনীতি সংস্কারে এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে এবার ৯ লাখ কোটি টাকারও বেশি অংকের একটি বড় ও ‘কোয়ালিটি বাজেট’ দেওয়া হচ্ছে। দারিদ্র্য বিমোচন ও জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য উন্নয়ন বাজেট বাড়ানো এবং সরকারি ব্যয় বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই বলে তিনি মনে করেন।
তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত ও বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে আগামী বাজেটে ইচ্ছা থাকলেও বড় ধরনের কর ছাড় দেওয়া হয়তো সম্ভব হবে না বলে মন্তব্য করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি জানান, কর-সুবিধার চেয়ে ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে বিদ্যমান প্রশাসনিক ও আমলাতান্ত্রিক বাধাগুলো সরিয়ে ব্যবসা করার খরচ কমানোকেই সরকার এখন অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
রাজস্ব আদায় বাড়াতে সরকার ‘ওয়ান সিটিজেন ওয়ান কার্ড’ এবং পূর্ণাঙ্গ ডিজিটালাইজেশনের পথে হাঁটছে বলে জানান মন্ত্রী। এর মাধ্যমে করদাতা ও কর্মকর্তাদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ কমানো হবে, যা দুর্নীতি হ্রাস করবে। মন্ত্রিসভায় ইতিমধ্যে এ সংক্রান্ত ডিজিটাল প্রজেক্ট পাস হয়েছে এবং আইএমএফ-এর কাছে দুই বছরের ‘কুশন’ বা সময় চাওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্য, শিল্প ও বস্ত্রমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, জুয়েলারি শিল্পকে সঠিক নীতি সহায়তা দিলে এ খাত থেকে বছরে ১২-১৪ বিলিয়ন ডলার আয় করা সম্ভব। তিনি স্বর্ণশিল্পকে ‘সাদা অর্থনীতির’ আওতায় আনার আশ্বাস দিয়ে বলেন, বর্তমানে এই খাতের বড় অংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক রয়ে গেছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী আরও বলেন, নতুন বিনিয়োগের চেয়ে বর্তমানে বিদ্যমান শিল্পকারখানাগুলোকে টিকিয়ে রাখা বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে। জ্বালানি সংকট এবং উচ্চ সুদের হারের কারণে অনেক শিল্প কঠিন সময় পার করছে। তিনি ব্যবসায়ীদের শুধু নিজস্ব খাতের সুবিধার কথা না ভেবে জাতীয় স্বার্থ বিবেচনা করে বাজেট প্রস্তাব দেওয়ার আহ্বান জানান।
এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতারা অংশ নেন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও এফবিসিসিআই-এর প্রশাসক আবদুর রহিম খান পুরো বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন। সভায় ব্যবসায়ীরা বন্দরে হয়রানি বন্ধ এবং কর নীতি সহজ করার দাবি জানান।













