বিশ্বের এক নম্বর এই পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রএখন ঢাকাকে এক কৌশলী বাণিজ্যিক জালে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকের প্রবেশাধিকার সচল রাখার ‘উচ্চমূল্য’ হিসেবে ওয়াশিংটন এখন ঢাকার ওপর এক পাহাড়প্রমাণ আমদানির দায়ভার চাপিয়ে দিয়েছে। শুধু বিপুল অংকের পণ্য আমদানিই নয়—বাংলাদেশকে এখন অভ্যন্তরীণ শুল্ক কাঠামো পরিবর্তন এবং সংবেদনশীল জাতীয় নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যবিধি সংক্রান্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা (অশুল্ক বাধা) শিথিল করার মতো কঠিন শর্ত মেনে নিতে হচ্ছে।
বিষয়টিতে এতদিন সামান্য কিছু ধোঁয়াশা থাকলেও মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) রাজধানীর শেরাটন হোটেলে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচেম) আয়োজিত এক হাই-লেভেল পলিসি ডায়ালগে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন তা স্পষ্ট করেছেন। তিনি জানিয়ে দিয়েছেন—যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্ক সুবিধা ধরে রাখতে হলে বাংলাদেশকে এখন থেকে বাধ্যতামূলকভাবে মার্কিন কৃষি ও জ্বালানি পণ্য কিনতেই হবে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র কয়েকদিন আগে সম্পাদিত হওয়া ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের এই ‘রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ বা পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির আড়ালে বাংলাদেশের সার্বভৌম অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো এখন ওয়াশিংটনের মর্জির ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন তাঁর দীর্ঘ ও পর্যালোচনামূলক বক্তব্যে এই চুক্তিকে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, “এই চুক্তিটি এমন এক নীতিমালা যা সাহায্যের পরিবর্তে বাণিজ্যকে এবং সহায়তার পরিবর্তে বিনিয়োগকে প্রাধান্য দেয়। এটি একটি জেনুইন পার্টনারশিপ যা দুই দেশের জন্যই সমান সুযোগ তৈরির একটি বড় প্ল্যাটফর্ম।”
রাষ্ট্রদূতের মতে, বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থানের কারণে একুশ শতকের একটি অন্যতম প্রধান ‘ম্যানুফ্যাকচারিং সেন্টার’ বা উৎপাদনকেন্দ্রে পরিণত হওয়ার পূর্ণ সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন যে, এই চুক্তি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন একটি নতুন ও অনন্য উচ্চতায় পৌঁছাবে।
তবে এই উন্নয়নের আশ্বাসের আড়ালে রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টেনসেন বাংলাদেশের বর্তমান রপ্তানি কাঠামোর সীমাবদ্ধতা ও ঝুঁকি কঠোরভাবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “কোনো দেশ যদি শুধু যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানি করে আর আমদানির ক্ষেত্রে অন্য দেশগুলোর ওপর নির্ভর করে, তবে সেই দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একটি দীর্ঘস্থায়ী বাণিজ্য-ঘাটতি তৈরি হয়। বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের বেশি বাণিজ্য ব্যবধান রয়েছে, যা মূলত বাংলাদেশের একতরফা তৈরি পোশাক রপ্তানির কারণে। এই ভারসাম্যহীনতা দূর করতে না পারলে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারবে না। তাই আপনারা যদি আমাদের কাছে পণ্য বিক্রি করতে চান, তবে আমাদের কাছ থেকেও পণ্য কেনার মানসিকতা ও চেষ্টা থাকতে হবে।”
চুক্তির ফলে বাংলাদেশ ঠিক কী কী সুবিধা পাবে, তার একটি কৌশলী তথ্যও দেন রাষ্ট্রদূত। তিনি জানান, বর্তমানে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর যে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের উচ্চ ঝুঁকি ছিল, এই চুক্তির ফলে তা ১৯ শতাংশে সীমাবদ্ধ থাকবে। তবে এই সুবিধার বিনিময়ে বাংলাদেশকে নিজস্ব শুল্ক ও অশুল্ক বাণিজ্য বাধাগুলো দ্রুত দূর করতে হবে। বিশেষ করে মার্কিন গম বা কৃষিপণ্য আমদানির ক্ষেত্রে রেডিয়েশন টেস্ট বা পেস্টিসাইড টেস্টের মতো প্রক্রিয়াগুলোকে তিনি ‘অপ্রাসঙ্গিক’ ও ‘বাণিজ্যের অন্তরায়’ হিসেবে কঠোর সমালোচনা করেন।
রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধিকে টিকিয়ে রাখতে ২০৫০ সালের মধ্যে জ্বালানি খাতে প্রায় ১৮ হাজার কোটি ডলারের বিশাল বিনিয়োগ প্রয়োজন। শেভরন বর্তমানে বাংলাদেশের মোট প্রাকৃতিক গ্যাসের অর্ধেক সরবরাহ করছে এবং তারা উৎপাদন আরও বাড়ানোর জন্য প্রস্তুত। এছাড়া এক্সিলারেট এনার্জি ও জিই ভার্নোভার মতো শীর্ষস্থানীয় মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোও বাংলাদেশে বড় অংকের বিনিয়োগে আগ্রহী।
প্রযুক্তি খাতের সম্ভাবনা নিয়ে তিনি বলেন, ১০ কোটির বেশি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী নিয়ে বাংলাদেশ দ্রুত ডিজিটাল অর্থনীতির দিকে এগোচ্ছে। এটি স্টারলিংক, গুগল পে, ওরাকল ও মাইক্রোসফটের মতো মার্কিন টেক জায়ান্টদের জন্য এক বিশাল সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করছে।
চুক্তি অনুসারে, বাংলাদেশকে ৩৫০ কোটি ডলারের মার্কিন কৃষিপণ্য (গম, সয়াবিন, তুলা ও ভুট্টা) কেনার প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে। এছাড়া আগামী ১৫ বছরে প্রায় ১৫০০ কোটি ডলারের জ্বালানি পণ্য (প্রধানত এলপিজি) আমদানির কঠিন দায়বদ্ধতাও সরাসরি বাংলাদেশের ওপর বর্তেছে।
রাষ্ট্রদূত এই আমদানির প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করে বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের গমের গুণগত মান ও প্রোটিনের পরিমাণ অনেক বেশি। অন্য দেশ থেকে আমদানিকৃত গমে পচনের হার ছিল প্রায় ২০ শতাংশ, সেখানে মার্কিন গমে এই হার মাত্র ২.৫ শতাংশ। এছাড়া প্রোটিনের পরিমাণও ১১.৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।”
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির তাঁর বক্তব্যে বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্পর্ক অনেক বছরের পুরনো এবং প্রবৃদ্ধিশীল। তবে আমাদের রপ্তানি কাঠামো অত্যন্ত সীমিত ও শুধু পোশাক খাতের ওপর কেন্দ্রীভূত হওয়াটা একটি বড় জাতীয় ঝুঁকি। এই চুক্তি আমাদের রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।”
তিনি আরও যোগ করেন যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল রূপান্তর এবং আইসিটি খাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত সহায়তা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত জরুরি। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন যে, জ্বালানি খাতে মার্কিন বিনিয়োগ ইতিবাচক অবদান রাখলেও সামগ্রিক সরাসরি বিনিয়োগ এখনো প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম।
অবশ্য এই ‘চাপিয়ে দেওয়া’ চুক্তিটি থেকেও বাংলাদেশের লাভবান হওয়ার কিছু সুনির্দিষ্ট পথ রয়েছে। জ্বালানি খাতে ১৫০০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানির বিনিময়ে যদি মার্কিন কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশে বড় ধরনের রিফাইনারি বা এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনে ও সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগে বাধ্য করা যায়, তবে দীর্ঘমেয়াদে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। এছাড়া ১৯ শতাংশ শুল্ক নিশ্চিত হওয়ায় ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ভিয়েতনাম বা ভারতের মতো দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় শক্তভাবে টিকে থাকা সম্ভব হবে বলে মনে করেন সংশ্লিস্টরা।
ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেনের বক্তব্য অনুযায়ী, এই চুক্তিটি কোনো দাতা-গ্রহীতার করুণার সম্পর্ক নয়, বরং একটি ‘পিওর বিজনেস ডিল’। বাংলাদেশ যদি সঠিকভাবে তার প্রশাসনিক ও নীতিগত সংস্কার করতে পারে এবং আমদানিকৃত মানসম্মত কাঁচামাল ব্যবহার করে আরও উচ্চমূল্যের পণ্য পুনরায় রপ্তানি করতে পারে, তবেই এই চুক্তি থেকে প্রকৃত সুফল ঘরে তোলা সম্ভব। অন্যথায় এটি কেবল একতরফা মার্কিন স্বার্থ রক্ষার একটি দলিল এবং বাংলাদেশের জন্য বিশাল আমদানির বোঝা ও সার্বভৌম অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এক প্রকার শৃঙ্খল হয়েই থেকে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে।













