জ্বালানি পরাধীনতা ঘোচাতে কেনো ‘সৌরবিপ্লব’

DSJ Web Photo April 27 2026 CPD
ছবি: সিপিডি

ডলার সংকটে আমদানিকৃত জ্বালানির উচ্চমূল্য আর ৫৬ হাজার কোটি টাকার বকেয়ার পাহাড়ে পিষ্ট দেশের বিদ্যুৎ খাত। অন্ধকারে নিমজ্জিত জনজীবনকে বাঁচাতে সরকার এখন আর তেল বা কয়লার অনিশ্চয়তার দিকে নয়, বরং তাকিয়ে আছে আকাশের সূর্যের দিকে। আমদানিনির্ভর জ্বালানির মরণফাঁদ থেকে বাঁচতে সরকার এখন সৌরবিদ্যুৎ বা সোলার এনার্জিকে করেছে একমাত্র ‘তুরুপের তাস’। এই লক্ষ্য অর্জনে রেলওয়েসহ দেশের সমস্ত সরকারি পতিত ও অব্যবহৃত জমি এখন সোলার প্যানেলে ঢেকে দেওয়ার এক মহাপরিকল্পনা নিয়ে সৌরবিপ্লবের ডাক দিয়েছে সরকার।

সোমবার (২৭ এপ্রিল) রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘চতুর্থ বাংলাদেশ-চীন নবায়নযোগ্য জ্বালানি ফোরাম’ শীর্ষক সেমিনারে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ এই পরিকল্পনার কথা জানান।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী অকপটে স্বীকার করেন যে, বকেয়া পাওনা আকাশচুম্বী হওয়ার কারণে বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলো প্রয়োজনীয় তেল ও কয়লা কিনতে পারছে না। নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে তিনি বলেন, “আমার কপাল খারাপ। দায়িত্ব নেওয়ার পরই লোডশেডিং শুরু হয়েছে।” তবে তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির পরাধীনতা থেকে বের হতে না পারলে এই সংকট কাটবে না। তাই সরকার এখন সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে সর্বশক্তি নিয়োগ করছে।

বিদ্যুৎমন্ত্রী জানান, আগামী পাঁচ বছরে ১০ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে দেশের পতিত সব সরকারি জমির তালিকা করতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, “সৌরবিদ্যুৎই এখন আমাদের একমাত্র সমাধান। রেলওয়ে দেশের সবচেয়ে বড় জমিদার, তাদের অনেক জমি অব্যবহৃত পড়ে আছে, যা আমরা এখন সোলার প্যানেল বসানোর কাজে লাগাতে চাই। এছাড়া সিরাজগঞ্জে ৯০০ একর খাস জমি চিহ্নিত করা হয়েছে, যা দ্রুতই বেসরকারি খাতে সোলার প্রকল্পের জন্য দেওয়া হবে। যমুনা নদীর তীরবর্তী খাস জমিও এই বিশাল কর্মযজ্ঞের আওতায় আনা হচ্ছে।”

সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার এক বৈপরীত্য চিত্র ফুটে ওঠে। বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট হলেও জ্বালানিসংকট, বকেয়া বিল ও কারিগরি ত্রুটির কারণে অর্ধেকের বেশি সক্ষমতা অলস পড়ে আছে।

পিডিবি ও পিজিসিবির তথ্যমতে, গত কয়েকদিন ধরে ১৪ হাজার মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদন করা যাচ্ছে না, যেখানে চাহিদা থাকছে ১৫ হাজার মেগাওয়াটের ওপরে। ড. মোয়াজ্জেম সতর্ক করে বলেন, সৌরবিদ্যুতের মতো বিকল্প জ্বালানিতে রূপান্তর ছাড়া এই সংকট স্বল্প সময়ে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়।

সিপিডির গবেষণায় দেখা গেছে, ২০৩০ সালের লক্ষ্য অর্জনে সৌর ও নবায়নযোগ্য খাতে প্রায় ৯.৩৬ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রয়োজন। কিন্তু নীতিগত জটিলতায় সম্প্রতি ৩১টি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের অনুমোদন বাতিল হওয়ায় প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি নেতিবাচক বার্তা।

এই পরিস্থিতি উত্তরণে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন জানান, সরকারি জমি ব্যবহারের জন্য ইতোমধ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদী গাইডলাইন তৈরি করা হয়েছে, যা পিপিপি মডেলে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের ১৫ থেকে ২০ বছরের জন্য জমি ব্যবহারের সুযোগ দেবে।

চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন এই মিছিলে বাংলাদেশের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়ে বলেন, বৈশ্বিক যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহ কবে স্বাভাবিক হবে তা কেউ বলতে পারবে না। তাই সৌরবিদ্যুৎ খাতে চীনের প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ তার জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের বিদেশি বিনিয়োগের অর্ধেকের বেশি আসছে চীন থেকে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আমদানিকৃত জ্বালানির উচ্চমূল্য আর বকেয়ার চাপে বিদ্যুৎ খাতকে খাদের কিনারা থেকে বাঁচাতে হলে অব্যবহৃত সরকারি জমি কাজে লাগিয়ে দ্রুত ‘সৌর বিপ্লব’ ঘটানোর বিকল্প নেই। আগামী সপ্তাহ থেকে লোডশেডিং ৮০০-৯০০ মেগাওয়াটে নামিয়ে আনার তাৎক্ষণিক প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি স্বনির্ভরতার জন্য সৌরশক্তিই এখন বাংলাদেশের প্রধান ভরসা।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top