বাজেটে খুচরা বিক্রেতাদের ওপর হাজারে দুই টাকা করের বোঝা এবং ব্যাংক থেকে সরকারের বিশাল ঋণ নেওয়ার সিদ্ধান্ত দেশের মূল্যস্ফীতি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টদের শীর্ষ সংগঠন আইসিএবি শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে এই গুরুতর আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। সংগঠনটির মতে, এই জোড়া ধাক্কায় নিত্যপণ্যের দাম যেমন বাড়বে, তেমনি বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহও মারাত্মকভাবে কমে যাবে।
কারওয়ান বাজারে সিএ ভবনে আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিশদ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়। আইসিএবির সভাপতি এন কে এ মবিন বলেন, খুচরা পর্যায়ে দশমিক ২ শতাংশ অগ্রিম করের প্রস্তাবটি অবিলম্বে বাদ দেওয়া উচিত। কারণ, স্থানীয় পর্যায়ের সব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এই করের আওতায় এলে বাজারে চাল-ডালসহ সব নিত্যপণ্যের দাম এক লাফে বেড়ে যাবে।
সংগঠনটির নেতারা আরও জানান, ট্রেড লাইসেন্স নবায়নের জন্য ভ্যাট নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করায় দেশের লাখো কুটির ব্যবসায়ী তীব্র ভোগান্তিতে পড়বেন। নতুন বাজেটে মোট ঘাটতি অর্থায়নের পরিমাণ ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকাই সরকার দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ঋণ নিয়ে পূরণ করার বিপজ্জনক পরিকল্পনা করেছে।
আইসিএবি সভাপতি সতর্ক করে বলেন, সরকারের এই অতিমাত্রার ব্যাংকঋণ নির্ভরতা বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের প্রাপ্যতা সম্পূর্ণ কমিয়ে দেবে। ফলে দেশের নতুন শিল্প সম্প্রসারণ ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। তবে বৈশ্বিক অস্থিরতার মাঝেও ৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকার উন্নয়ন বাজেট (এডিপি) নেওয়ার উদ্যোগকে তারা ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।
সংবাদ সম্মেলনে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টরা বলেন, ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার বিশাল রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে কর প্রশাসনে জরুরি কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। কর আদায়ের প্রক্রিয়া সহজ ও সম্পূর্ণ আধুনিক করতে কর নির্ধারণ এবং আপিল শুনানির পুরো ব্যবস্থাটি দ্রুত অনলাইন ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে রূপান্তর করার তাগিদ দিয়েছে সংগঠনটি।
এবারের বাজেটে ন্যূনতম কর যৌক্তিকীকরণ এবং নগদ লভ্যাংশের ওপর থেকে অতিরিক্ত কর প্রত্যাহারের মতো আইসিএবির বেশ কয়েকটি সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত করায় অর্থমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানানো হয়। এছাড়া এনবিআর এবং আইসিএবি যৌথভাবে ‘ডকুমেন্ট ভেরিফিকেশন সিস্টেম’ (ডিভিএস) চালু করায় কর ফাঁকি রোধে ইতিমধ্যে বড় সাফল্য এসেছে বলে সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়।
রহমান রহমান হক চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টসের পরিচালক সরকার নাহিদুল ইসলাম বলেন, ২০২৬ সালের এলডিসি উত্তরণকে সামনে রেখে কর কাঠামোকে ৫টি ক্যাটাগরিতে পুনর্গঠন করা ভালো উদ্যোগ। লভ্যাংশ প্রক্রিয়াকরণের সময়সীমা ৩০ দিনে বেঁধে দেওয়া এবং শ্রম, পরিবহন ও সৌরবিদ্যুতের ক্ষেত্রে ভ্যাট ইনপুট ক্রেডিট বা রেয়াতের পরিধি সম্প্রসারণ করায় করের দক্ষতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
স্নেহাশিষ মাহমুদ অ্যান্ড কোম্পানির পার্টনার স্নেহাশিষ বড়ুয়া মাঠপর্যায়ের বাস্তব রূপায়ণ নিয়ে মূল উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি স্পষ্ট বলেন, এনবিআরের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের দ্বারা ব্যবসায়ীদের হয়রানি বন্ধ করা না গেলে করের জাল বাড়বে না। ফলে নতুন করদাতা খোঁজার পরিবর্তে কেবল পুরোনো ও নিয়মিত করদাতাদের ওপরই রাজস্ব আদায়ের অন্যায্য ও বাড়তি চাপ তৈরি হতে থাকবে।













