সরকার এখন করের হার না বাড়িয়েও শলাকার খুচরা মূল্য পুনর্নির্ধারণের মাধ্যমে রাজস্ব বাড়াতে চায়। বর্তমানে ১০ টাকার একটি সিগারেটের মধ্যে ৮ টাকা ৩০ পয়সাই সরকারি কোষাগারে চলে যায়। করের এই বোঝা আর বাড়ানো সম্ভব নয় বলেই মনে করছেন নীতিনির্ধারকরা। তবে রাজস্বের বিশাল লক্ষ্যমাত্রা পূরণে তারা প্রতিবেশী দেশগুলোর দোহাই দিয়ে খুচরা বাজারমূল্য বাড়ানোর কৌশল হাতে নিচ্ছেন।
মূলত উৎপাদনকারীদের ওপর নতুন করে কর না চাপিয়ে সরাসরি ভোক্তার পকেট থেকে টাকা আদায়ের এই ছক কষছে এনবিআর। সোমবার (২৭ এপ্রিল) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে রাজস্ব ভবনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রাক-বাজেট আলোচনা সভায় এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন।
তিনি বলেন, সিগারেটের ওপর ৮৩ শতাংশের বেশি শুল্ক-কর যাওয়ার উপায় নেই। তবে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের দাম দেখে দাম পুনর্নির্ধারণ করা হতে পারে; কারণ আমাদের দেশে সিগারেটের দাম প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় এখনও কম।
সোমবার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রাক-বাজেট আলোচনা সভায় ন্যাশনাল সিগারেট ম্যানুফ্যাকচারার অ্যাসোসিয়েশন (এনসিএমএ) এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় তামাক পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেন এনবিআর চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
সভায় এনসিএমএ-এর প্রতিনিধিরা জানান, দেশের সিগারেট শিল্প বর্তমানে এক চরম অস্থিরতা ও অস্তিত্ব সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সরকারের ত্রুটিপূর্ণ শুল্ক কাঠামো এবং অবৈধ কর-ফাঁকি দেওয়া সিগারেটের বাজার বড় হতে থাকায় এই খাত থেকে বড় অংকের রাজস্ব হারাচ্ছে রাষ্ট্র।
সভায় এনসিএমএ প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে সিগারেট খাত থেকে রাজস্ব ছিল ২৯ হাজার ৯৯৬ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা ৪৫ হাজার ৯৬৬ কোটি টাকায় পৌঁছানোর প্রাক্কলন থাকলেও প্রবৃদ্ধির হার অত্যন্ত ধীর। উৎপাদনকারীদের দাবি, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের অন্তর্বর্তীকালীন বাজেটের কঠোর ও অবাস্তব শুল্ক নীতির কারণে বাজারের মোট ভলিউমের ২০ শতাংশ বৈধ কর জালের বাইরে চলে গেছে, যার ফলে বছরে প্রায় ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
আবুল খায়ের গ্রুপের হেড অব করপোরেট অ্যাফেয়ার্স শেখ শাবাব আহমেদ সভায় জানান, বর্তমানে দেশে ৩০টি সিগারেট কারখানা এবং ৬টি তামাক প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা থাকলেও এর একটি বড় অংশ অবৈধ প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত। বছরে প্রায় ১,৮০০ কোটি শলাকা সিগারেট কর ফাঁকি দিয়ে বিক্রি হচ্ছে। এই অবৈধ কারবারের কারণে সরকার ২২ শতাংশ পোটেনশিয়াল রেভিনিউ লস করছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
সিগারেট শিল্পের প্রতিনিধিদের মতে, নিম্ন স্তরের সিগারেটের ওপর অস্বাভাবিক হারে কর বাড়ানোই বর্তমান সংকটের মূল কারণ। দেশে যখন গড় মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশ, তখন নিম্ন স্তরের সিগারেটের দাম বাড়ানো হয়েছে ২০ শতাংশ। অথচ উচ্চ ও প্রিমিয়াম স্তরের সিগারেটের দাম বেড়েছে মাত্র ৩ থেকে ৮ শতাংশের মধ্যে।
বিগত ৫ বছরের শুল্ক কাঠামো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, উচ্চ স্তরের সিগারেটের সম্পূরক শুল্ক মাত্র ২ শতাংশ বাড়লেও নিম্ন স্তরের ক্ষেত্রে তা বেড়েছে ১০ শতাংশ। বর্তমানে ভ্যাট, সম্পূরক শুল্ক ও স্বাস্থ্য সারচার্জ মিলিয়ে এই খাতে মোট করের হার দাঁড়িয়েছে ৮৩ শতাংশ। এই অতিরিক্ত করের বোঝা এবং অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে স্বল্প আয়ের মানুষ বৈধ ব্র্যান্ডের সিগারেট ছেড়ে সস্তা ও কর-ফাঁকি দেওয়া অবৈধ সিগারেটের দিকে ঝুঁকছে। এর ফলে নিম্ন স্তরের সিগারেট উৎপাদনকারীদের মুনাফার মার্জিন (ম্যানুফ্যাকচার কন্ট্রিবিউশন মার্জিন) বর্তমানে নেতিবাচক পর্যায়ে (-২% সিএআরজি) চলে গেছে।
অবৈধ বাজার বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান জানান, অবৈধ কারবার ও কর ফাঁকি বন্ধে সরকার প্রতিটি সিগারেটের প্যাকেটে ‘কিউআর কোড’ বা বিশেষ ‘এয়ার কোড’ বসানোর উদ্যোগ নিচ্ছে। এর মাধ্যমে উৎপাদন থেকে বিক্রয় পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ের আওতায় আসবে।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সিগারেট শিল্পে যদি এই ৮,৫০০ কোটি টাকার কর ফাঁকি রোধ করা যায়, তবে আগামী বাজেটে কোনো অতিরিক্ত করারোপ ছাড়াই এ খাত থেকে অতিরিক্ত ১০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় সম্ভব। কিন্তু স্রেফ দাম বাড়িয়ে রাজস্ব বাড়ানো হলে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর চাপ বাড়ার পাশাপাশি অবৈধ বাজারের প্রলোভন আরও শক্তিশালী হওয়ার ঝুঁকি থেকে যাবে।
সভায় শিল্প রক্ষায় এনসিএমএ বেশ কিছু সুপারিশ পেশ করেছে। তারা বলছে, নিম্ন স্তরের সিগারেটের দাম আর বাড়ানো যাবে না, অন্যথায় অবৈধ বাজার আরও বিস্তার লাভ করবে। তবে রাজস্ব নিশ্চিত করতে উচ্চ ও মাঝারি স্তরের সিগারেটের দাম যৌক্তিক হারে বাড়ানো যেতে পারে। একই সাথে তামাক প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানাগুলোতে অবৈধ উৎপাদন বন্ধে এনবিআর ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত অভিযান জোরদার করার দাবি জানানো হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুল্কের হার স্থির রেখে যদি ১০ টাকার সিগারেটের দাম ১২ টাকা করা হয়, তবে ৮৩ শতাংশ হারে সরকারের পকেটে আসা টাকার পরিমাণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেড়ে যাবে। মূলত শুল্কের বোঝা থেকে উৎপাদনকারীদের রেহাই দিয়ে সরাসরি ভোক্তার ওপর বাড়তি ব্যয়ের বোঝা চাপানোর এটি একটি বিশেষ কৌশল।













