পণ্য খালাসে চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টমসে গেড়ে বসা ঘুষ-দুর্নীতির পাহাড় সমান হয়রানি বন্ধ করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যানের প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ। রোববার রাজধানীর রাজস্ব ভবনে অনুষ্ঠিত প্রাক-বাজেট আলোচনায় তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, “আপনারা ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধ করেন, তাহলে আপনারা যা রাজস্ব চাইবেন আমরা তা-ই দেবো। কোনো কিছু কমানোর কথা বলব না।”
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই আলোচনায় বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিটিএমইএ, বায়িং হাউস অ্যাসোসিয়েশনসহ বিভিন্ন উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। এতে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীও উপস্থিত ছিলেন।
আলোচনার শুরুতেই এনবিআর চেয়ারম্যান রাজস্ব আদায়ের সংকটের কথা তুলে ধরে বলেন, ১ কোটি ২৮ লাখ টিআইএনধারী থাকলেও বড় একটি অংশ রিটার্ন দাখিল করে না। এবার যারা রিটার্ন দেবে না, তাদের নোটিশ করা হবে এবং প্রয়োজনে ইন্সপেক্টররা তাদের আয়-ব্যয়ের হিসাব নিতে ঘরে ঘরে যাবেন।
ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে প্রথম অভিযোগ তোলেন বাংলাদেশ টেরি টাওয়েল অ্যান্ড লিলেন ম্যানুফেকচার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এম শাহদাত হোসেন। তিনি বলেন, পণ্য খালাসে ব্যবসায়ীদের পদে পদে হয়রানির শিকার হতে হয়। ভ্যাট, বন্ড আর ট্যাক্স অডিটের নামে ব্যবসায়ীরা এখন চরম অডিট যন্ত্রণায় ভুগছেন। ঘুষ আর অডিট বাণিজ্য বন্ধ করা গেলে ব্যবসায়ীরা করের হার নিয়ে আর অভিযোগ করবে না। কর কমাতেও বলবেন না।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস বায়িং হাউস অ্যাসোসিয়েশন রপ্তানির স্যাম্পল পণ্যের ওপর থেকে ভ্যাট ও ট্যাক্স প্রত্যাহারের আবেদন জানায়। তারা অভিযোগ করে যে, বিজিএমইএ বন্ড সুবিধা পেলেও বায়িং হাউসগুলো বঞ্চিত হচ্ছে। এর জবাবে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া সহজ করতে গিয়ে দেখা গেছে অনেক সুবিধার ব্যাপক অপব্যবহার হয়েছে। বিশেষ করে বন্ডের অপব্যবহারের তথ্য প্রকাশ করলে মানুষ তাজ্জব হয়ে যাবে। এই অপব্যবহারের কারণেই দেশের অনেক শিল্প গড়ে উঠতে পারেনি। তবে তিনি আইন ও বিধি সংশোধনের আশ্বাস দিয়ে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে সব ধরনের ‘লিকেজ’ বন্ধের নিশ্চয়তা চান।
বিজিএমইএ প্রেসিডেন্ট মাহমুদ হাসান খান পোশাক শিল্পের সংকট তুলে ধরে বলেন, শিপমেন্টের চাপে বাধ্য হয়ে আমাদের সাব-কন্ট্রাক্টিং করতে হয়। কিন্তু এর ওপর ভ্যাট ও অগ্রিম কর দিতে হয়, যা মূলত দ্বৈত কর। তিনি এই দ্বৈত কর প্রত্যাহার এবং টার্নওভারের ওপর উৎস কর ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে ০.৬৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করেন।
একইসাথে রপ্তানি প্রণোদনার ওপর ১০ শতাংশ কর আরোপের কড়া সমালোচনা করে ব্যবসায়ীরা বলেন, প্রণোদনা হলো সরকারের এক ধরণের ভর্তুকি বা ‘খয়রাতি অর্থ’। এই খয়রাতির ওপর কেন ট্যাক্স হবে? তারা প্রণোদনার ওপর থেকে কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের দাবি জানান।
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বন্দরে আমদানিকৃত পণ্যের টেস্টিং নিয়ে হয়রানির চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “আমদানি প্রাপ্যতা ও টেস্টিংয়ের দীর্ঘসূত্রতার কারণে গত বছর আমাকে সাড়ে ৭ কোটি টাকা ডেমারেজ দিতে হয়েছে। ১৫-২০ বছর ধরে ব্যবসা করছি, কোনো অভিযোগ নেই, তবুও কেন এই হয়রানি?” এর জবাবে চেয়ারম্যান বলেন, টেস্টিংয়ের চাহিদা এনবিআরের নয় বরং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের; তাই ঝগড়াটা ওই মন্ত্রণালয়ের সাথেই করা উচিত।
জ্বালানি সংকটের মুখে সোলার সিস্টেমের গুরুত্ব তুলে ধরে মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বর্তমানে ২ থেকে ৩ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে, ফলে কারখানায় সোলার জরুরি হয়ে পড়েছে। কিন্তু সোলার জেনারেটর আমদানিতে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের কর্মকর্তারা নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছেন। তিনি এর দালিলিক প্রমাণও চেয়ারম্যানের হাতে তুলে দেন। জবাবে চেয়ারম্যান বলেন, সোলারের জন্য এনবিআর সবকিছুই করবে, যদি কেউ এর বিরোধিতা না করে।
ভ্যাট প্রসঙ্গে এনবিআর চেয়ারম্যান জানান, বর্তমানে দেশে মাত্র ৮ লাখ ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান আছে, যা খুবই কম। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের হয়রানি কমাতে বছরে একটি নির্ধারিত ভ্যাট জমা দেওয়ার পদ্ধতি চালু হবে, তাদের প্রতি মাসে রিটার্ন দিতে হবে না। এছাড়া ভ্যাট ফাঁকি রোধে প্যাকেজিং পণ্যের গায়ে কিউআর বা এআর কোড চালুর পরিকল্পনা রয়েছে, যা প্রাথমিকভাবে তামাকজাত পণ্যের মাধ্যমে শুরু হবে।













