ইসলামী ব্যাংকসহ পাঁচটি ব্যাংকের মালিকানা এস আলম গ্রুপের কাছে ফেরত দেওয়া এবং চাকরি পুনর্বহালের দাবিতে রাজধানীর দিলকুশায় আজ এক বিশাল বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে পটিয়া অঞ্চল থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত একদল চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা। অন্যদিকে, এর প্রতিবাদে এবং লুটেরাদের গ্রেপ্তারের দাবিতে ‘ইসলামী ব্যাংক ভুক্তভোগী গ্রাহক সমন্বয় পরিষদ’-এর ব্যানারে পাল্টা কর্মসূচি পালিত হওয়ায় মতিঝিল এলাকা উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
আজ রবিবার (১৯ এপ্রিল) সকাল ১০টা থেকে ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে জড়ো হন একসময় এস আলমের নিয়ন্ত্রণে থাকা ছয়টি ইসলামী ব্যাংক থেকে চাকরিচ্যুত কয়েক হাজার কর্মী। আন্দোলনকারীরা ‘আমার সোনার বাংলায় বৈষম্যের ঠাঁই নাই’ স্লোগান দিয়ে নিজেদের বৈষম্যের শিকার বলে দাবি করেন। তাঁদের দাবিগুলোর মধ্যে প্রধান হলো—এস আলম গ্রুপের কাছে ব্যাংকের মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়া, বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ বাতিল এবং চাকরিচ্যুতদের অবিলম্বে পুনর্বহাল করা।
সম্প্রতি পাস হওয়া ‘ব্যাংক রেজুলেশন আইন-২০২৬’-এর দোহাই দিয়ে আন্দোলনকারীরা সামাজিক মাধ্যমেও ব্যাপক সরব হয়েছেন। অভিযোগ উঠেছে, তাঁরা বর্তমান ব্যাংক কর্মকর্তাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তিতে তৈরি ছবি ব্যবহার করে অনলাইনে নানাভাবে বিতর্কিত করার চেষ্টা চালাচ্ছেন।
সূত্র জানায়, এই আন্দোলনকে বড় করে দেখানোর জন্য গত দুদিন ধরে চট্টগ্রাম ও পটিয়া অঞ্চল থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষকে ঢাকায় এনে বিভিন্ন হোটেলে রাখা হয়। গতকাল রাতেও কয়েকশ মোটরসাইকেল ও মাইক্রোবাসে করে তাঁদের একটি বড় অংশ ঢাকায় পৌঁছায়।
আন্দোলনকারীদের পক্ষে পটিয়া এলাকার আল-আমিন বলেন, সরকার পরিবর্তনের পর তাঁদের বিনা কারণে ছাঁটাই করা হয়েছে, তাই আগের মালিকের হাতে মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়াই এখন তাঁদের মূল লক্ষ্য।
ঠিক একই স্থানে দুপুর সাড়ে ১২টায় ‘ইসলামী ব্যাংক ভুক্তভোগী গ্রাহক সমন্বয় পরিষদ’ পাল্টা মানববন্ধন কর্মসূচি শুরু করে। সমাবেশ থেকে পরিষদের সভাপতি নূরুন নবী মানিক ৫ দফা দাবি পেশ করেন। দাবিগুলো হলো— এস আলমসহ সব শীর্ষ লুটেরাকে গ্রেপ্তার ও দেশে থাকা তাঁদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা এবং পাচার করা অর্থ ফেরত আনা; ব্যাংক রেজুলেশন আইনে সংযোজিত ১৮/ক ধারা বাতিল করা; ব্যাংকের সামনে ‘মব’ সৃষ্টিকারীদের সুযোগ দেওয়া হলে উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য সরকারকে দায়-দায়িত্ব নিতে হবে; মব সৃষ্টিকারী কাউকে ব্যাংকে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া যাবে না এবং ব্যাংকের প্রকৃত মালিকদের হাতে অতিসত্বর মালিকানা ফেরত দিতে হবে। এসব দাবি আদায়ে আগামী ১৫ দিন লিফলেট বিতরণ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়।
গ্রাহক ফোরামের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে, ২০১৭ সালে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে ইসলামী ব্যাংক জবরদখল করেছিল এস আলম গ্রুপ। সে সময় ৬৩ জেলার মানুষকে বঞ্চিত করে শুধু পটিয়া ও চট্টগ্রামের লোকদের অবৈধভাবে নিয়োগ দিয়ে সাধারণ মানুষের অধিকার লঙ্ঘন করা হয়েছিল।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত শুধু চট্টগ্রাম থেকেই ৭,২২৪ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, যার বড় অংশই এক উপজেলার। সম্প্রতি আইবিএ-এর মাধ্যমে তাঁদের দক্ষতা যাচাই পরীক্ষার আয়োজন করা হলেও অধিকাংশ কর্মকর্তা সেই পরীক্ষায় অংশ নেননি।
বর্তমানে ব্যাংকের এমডি ফারুক হোসেন খানকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো নিয়ে কিছুটা গুঞ্জন থাকলেও কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে। তবে সরকারের উচ্চপর্যায়ের ইন্ধনে এই অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ দাবি করেছেন।
সার্বিক বিষয়ে ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মো. আলতাফ হোসেন বলেন, নিয়োগপ্রাপ্তরা চাকরি ফেরতের দাবি জানাতে পারলেও মালিকানা ফেরতের হুমকি দিতে পারেন না, কারণ বিষয়টি আদালতের এখতিয়ারাধীন। তিনি নিশ্চিত করেন যে, এসব আন্দোলনে ব্যাংকের কোনো ক্ষতি হয়নি; বরং আমানত ও গ্রাহক আস্থা ক্রমান্বয়ে বেড়েছে।













