পোশাক, জ্বালানি ও প্রবাসী আয় নিয়ে যে শঙ্কা

ডিএসজে কোলাজ
ডিএসজে কোলাজ

বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির প্রধান দুই স্তম্ভ—তৈরি পোশাক রপ্তানি এবং প্রবাসী আয়—বর্তমানে নজিরবিহীন এক সঙ্কটের মুখে। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির আকাশচুম্বী দাম ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির ঝুঁকি, অন্যদিকে ইউরোপের বাজারে এলডিসি উত্তরণ পরবর্তী শুল্ক আরোপের খড়্গ; এই দুইয়ে মিলে বাংলাদেশের অর্থনীতির ‘সুসময়’ দ্রুতই ধূসর হয়ে উঠছে। চলতি সপ্তাহে রাজধানীতে আয়োজিত পৃথক দুটি সেমিনারে অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা এই উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন।

রবিবার (১৫ মার্চ) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে ‘ভয়েস ফর রিফর্ম’ ও ‘পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ’ আয়োজিত সভায় মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের প্রভাব নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ বলেন, “বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের আমদানিনির্ভরতা এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুদ্ধের কারণে জ্বালানি আমদানি ব্যয় ১০-১১ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ১৭-১৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।” তিনি আরও যোগ করেন, “লোহিত সাগরে নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে পরিবহন খরচ প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে এবং সময় লাগছে অতিরিক্ত ১০ থেকে ১৬ দিন। এর ফলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের প্রতিযোগী সক্ষমতা কমছে।”

প্রবাসী আয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ভয়েস ফর রিফর্মের সহ-সমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর বলেন, “সংঘাতের কারণে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে গেলে বছরে ৫ থেকে ৬ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি তৈরি হতে পারে।” জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শফিকুল আলম জানান, “তেলের দাম ১০ শতাংশ বাড়লে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১ টাকা ৬০ পয়সা বেড়ে যায়।” এই পরিস্থিতি সামাল দিতে এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার ম্যাগাজিনের সম্পাদক মোল্লা এম আমজাদ হোসেন সরকারকে পরামর্শ দিয়ে বলেন, “অনুৎপাদনশীল খাতে দৈনিক অন্তত তিন ঘণ্টা লোডশেডিং করা প্রয়োজন।”

অন্যদিকে, শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগে ‘র‌্যাপিড’ আয়োজিত এক সভায় ইউরোপের বাজারে পোশাকের দাম নিয়ে গবেষণার তথ্য প্রকাশ করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, শুল্ক সুবিধার কারণে ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে বেশি দাম পাওয়া যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে র‌্যাপিডের উপপরিচালক জিল্লুর রহমান বলেন, “শীর্ষ ১০টি পোশাক পণ্যের ক্ষেত্রে ইউরোপীয় বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ৫ থেকে ১৮ শতাংশ বেশি দাম পাওয়া যায়। বিশেষ করে টি-শার্ট রপ্তানিতে জার্মানিতে ২০-২৭ শতাংশ বেশি দাম পাওয়া যায়।” তবে এলডিসি উত্তরণ পরবর্তী ঝুঁকি নিয়ে তিনি সতর্ক করে বলেন, “এলডিসি উত্তরণের পর ইইউ বাজারে প্রায় ১২ শতাংশ শুল্ক আরোপের বড় ঝুঁকি রয়েছে, যা দেশের প্রধান এই রপ্তানি খাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে।”

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. আবদুর রহিম খান পরিস্থিতি পর্যালোচনায় বলেন, “প্রস্তুতি ছাড়া এলডিসি উত্তরণ হলে এবং অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা না থাকলে দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোতে বড় আঘাত আসবে।” বিশ্বব্যাংকের উপদেষ্টা হাফিজুর রহমান এ থেকে উত্তরণের পথ বাতলে দিয়ে বলেন, “বাংলাদেশকে ‘লো-কস্ট’ ব্র্যান্ড থেকে ‘হাই-প্রাইস’ ব্র্যান্ডে রূপান্তর হতে হবে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়বে।”

সেমিনার দুটিতে বিশেষজ্ঞরা একমত হয়েছেন যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের চেয়ে বাস্তবতার ভিত্তিতে কঠিন অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। গত ১৮ মাস ধরে অর্জিত অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে সরকারকে দ্রুত ও সমন্বিত কৌশল নিয়ে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top