রপ্তানি খাত রক্ষায় সরকারের ত্রিমুখী উদ্যোগ

ডিএসজে কোলাজ
ডিএসজে কোলাজ

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের দামামা এবং বিশ্ব বাণিজ্যের লাইফলাইন ‘হরমোজ প্রণালী’ বন্ধের হুমকিতে যখন বিশ্ব অর্থনীতি টালমাটাল, ঠিক তখনই বাংলাদেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী রপ্তানি খাতকে খাদের কিনারা থেকে টেনে তুলতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক।

জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১২০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় যখন বাংলাদেশের আমদানিনির্ভর শিল্প খাত দিশেহারা, ঠিক তখনই দেশের সচল রপ্তানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর শ্রমিক-কর্মচারীদের ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন-ভাতা পরিশোধে এক বিশেষ ঋণ সুবিধার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

মূলত বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)-এর পক্ষ থেকে সাম্প্রতিক তীব্র তারল্য সংকটের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই জরুরি সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

পোশাক শিল্পমালিকরা যদিও দুই মাসের বেতনের সমপরিমাণ অর্থাৎ এক হাজার ৪০০ কোটি টাকার সফট লোনের দাবি জানিয়েছিলেন, তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন সার্কুলার অনুযায়ী সচল রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য এক মাসের বেতন-ভাতার সমপরিমাণ ঋণের সুবিধা দেওয়া হবে। এই বিশেষ ঋণ সুবিধা পেতে হলে প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে।

২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ের বেতন নিয়মিত পরিশোধকারী প্রতিষ্ঠানগুলোই কেবল সচল হিসেবে বিবেচিত হবে এবং প্রতিষ্ঠানের মোট উৎপাদনের ন্যূনতম ৮০ শতাংশ রপ্তানি হতে হবে। ঋণের পরিমাণ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিগত তিন মাসের গড় বেতন-ভাতার বেশি হবে না এবং এর বিপরীতে বাজারভিত্তিক প্রচলিত সুদের হার কার্যকর হবে।

শ্রমিকদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঋণের অর্থ সরাসরি তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট অথবা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সিস্টেম অ্যাকাউন্টে প্রদান করা হবে। এটি একটি মেয়াদী ঋণ হবে যার সর্বোচ্চ মেয়াদ এক বছর এবং উদ্যোক্তাদের স্বস্তির জন্য তিন মাসের গ্রেস পিরিয়ড সুবিধা দেওয়া হয়েছে।

একই দিনে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পসহ সংশ্লিষ্ট খাতগুলোর বকেয়া নগদ সহায়তার বিপরীতে দুই হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয় কর্তৃক জারিকৃত প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তৃতীয় কিস্তির প্রথম ধাপে এক হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং দ্বিতীয় ধাপে এক হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান এই জরুরি ও সময়োপযোগী পদক্ষেপের জন্য সরকারের শীর্ষ পর্যায়সহ সংশ্লিষ্টদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান যে, আসন্ন ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে পোশাক শিল্পের মালিকদের ওপর যখন শ্রমিকদের বেতন-ভাতা, বোনাস এবং বিদ্যুৎ-গ্যাস বিল পরিশোধের প্রবল চাপ তৈরি হয়েছে, ঠিক সেই মুহূর্তে এই অর্থ বরাদ্দ শিল্প মালিকদের জন্য এক বড় স্বস্তি নিয়ে এসেছে।

এদিকে আজ মঙ্গলবার (৩ মার্চ) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদের (টিসিসি) সভায় শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী আগামী ৯ মার্চের মধ্যে শ্রমিকদের ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন এবং ১২ মার্চের মধ্যে ঈদুল ফিতরের বোনাস দেওয়ার সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন।

সভায় শিল্প পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, দেশের ১৮০টি তৈরি পোশাক কারখানায় বেতন-বোনাস পরিশোধ না হওয়ার আশঙ্কায় শ্রম অসন্তোষ তৈরি হতে পারে। শিল্প পুলিশের তথ্যমতে, দেশের ৭৪৭টি কারখানা গত জানুয়ারি মাসের বেতন দিতে পারেনি এবং ১৪৯টি কারখানার নভেম্বর-ডিসেম্বরের বেতন এখনও বকেয়া রয়েছে। শ্রমিকদের পক্ষ থেকে ঈদের আগেই বেতন-বোনাস নিশ্চিত করার পাশাপাশি সরকারি ছুটির সঙ্গে মিল রেখে ছুটির দাবি জানানো হয়েছে।

সভায় বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন যে, সর্বশেষ সাত মাস ধরে দেশের রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধি কমছে এবং পরিস্থিতি বেশ ভয়াবহ। তবে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির জানান যে, নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য ফ্যামিলি কার্ডের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে যা শ্রমিকদের কিছুটা উপকার করবে।

শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিনও সঠিক সময়ে বেতন পরিশোধ এবং পরিবহন ভাড়া নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়ে সরকারের অবস্থান ব্যক্ত করেন।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top