৪০ হাজার কোটির ব্যাংক উদ্ধার তহবিল ব্যর্থ হওয়ার শঙ্কা বিএবির

Web Photo Card June 14 2026 BaB
ডিএসজে

প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে জনগণের ট্যাক্সের প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা দিয়ে দেশের দুর্বল ও সংকটাপন্ন ব্যাংকগুলোকে বাঁচানোর যে বিশাল সরকারি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হতে পারে বলে তীব্র শঙ্কা প্রকাশ করেছে বেসরকারি ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি)। সংগঠনটি জানিয়েছে, অতীতে ব্যাংক খাত থেকে আত্মসাৎ ও লুট হওয়া অর্থ যদি আইনি প্রক্রিয়ায় দ্রুত উদ্ধার করে আমানতকারীদের স্বার্থে ফেরত আনা না হয়, তবে এই পুনঃমূলধনীকরণ কেবল সাময়িক স্বস্তি দেবে, দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক খাতকে কোনোভাবেই রক্ষা করতে পারবে না।

রবিবার (১৪ জুন) বিএবির চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকার স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এমন শঙ্কা প্রকাশ করেছে সংগঠনটির এক্সিকিউটিভ কমিটি। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ঘোষিত বাজেটকে দেশের আর্থিক খাতের জন্য একটি ‘সাহসী মোড় পরিবর্তন’ আখ্যা দিয়ে স্বাগত জানালেও বিএবি মনে করে, জনসাধারণের অর্থ দিয়ে ব্যাংক শক্তিশালী করার সরকারি প্রচেষ্টা তখনই সফল হবে, যখন অর্থের অপব্যবহারকারী ও লুটেরাদের কঠোর জবাবদিহির আওতায় এনে সম্পদ রিকভারি করা নিশ্চিত হবে।

এই ব্যাংক উদ্ধার অভিযান সফল করতে এবং দেশের ভঙ্গুর আর্থিক ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করতে বিএবির পক্ষ থেকে আট দফার এক নীতিগত সংশোধনী প্রস্তাব পেশ করা হয়েছে। ব্যাংক মালিকদের মতে, খেলাপি ঋণের পাহাড় কমাতে এবং ব্যালান্স শিটের ক্ষত পরিষ্কার করতে বাজেটে একটি স্বাধীন ‘সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি’ (এএমসি) গঠনের জন্য সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ রাখা উচিত ছিল। একই সাথে বিগত আমলের অনিয়মের মাধ্যমে অর্জিত শেয়ার ও অবৈধ সম্পদের বিষয়ে একটি সম্পূর্ণ স্বচ্ছ নীতি প্রয়োগের জোর দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

ব্যাংকিং খাতের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখতে প্রস্তাবিত ব্যাংক রেজোলিউশন ফ্রেমওয়ার্ক বা ব্যাংক অবসান কাঠামোতে সুনির্দিষ্ট এবং কঠোর সুরক্ষাকবচ রাখার তাগিদ দিয়েছে বিএবি। বিবৃতিতে বলা হয়, অতীতে যেসব অসাধু চক্র ও প্রভাবশালী ব্যক্তির অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে ব্যাংকগুলো আজকের এই চরম সংকটে ও দেউলিয়ার মুখে পড়েছে, তারা যাতে কোনো অবস্থাতেই ঘুরপথে আবার ব্যাংকিং খাতের কোনো ধরনের বোর্ডে বা মালিকানায় পুনর্বাসিত হতে না পারে, তা রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে।

বাজেট ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকার বিশাল অঙ্কের ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রাকে ব্যাংকিং খাতের জন্য বিপজ্জনক বলে সতর্ক করেছে বিএবি। এমন এক সময়ে এই বিপুল ঋণ নেওয়া হচ্ছে যখন বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ ঐতিহাসিক সর্বনিম্নে অবস্থান করছে। ফলে সরকারের এই নীতি বেসরকারি খাতকে চরমভাবে কোণঠাসা করবে বিধায় বিএবি সরকারকে বহিরাগত অর্থায়ন পরিকল্পনায় কঠোরভাবে লেগে থাকার এবং বিকল্প হিসেবে দ্রুত বন্ড মার্কেট সচল করার তাগিদ দিয়েছে।

করজাল বাড়ানোর লক্ষ্যে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের জন্য টিআইএন বাধ্যতামূলক করা এবং ব্যাংকের ডাটাবেজের সাথে ট্যাক্স অফিসের ডিজিটাল সংযোগের নীতিকে সমর্থন করলেও তা ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছে বিএবি। বিশেষ করে গ্রামীণ ও ক্ষুদ্র আমানতকারীদের জন্য একটি যৌক্তিক সীমা নির্ধারণ করা উচিত, অন্যথায় করের ভীতি তৈরি হলে বিগত দুই দশক ধরে কষ্টার্জিত গ্রামীণ ‘আর্থিক অন্তর্ভুক্তি’ সম্পূর্ণ ভেস্তে যেতে পারে এবং মানুষ ব্যাংকিং চ্যানেল থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে।

বর্তমানে ব্যাংকগুলোর ওপর আরোপিত সাড়ে ৩৭ শতাংশের চড়া করপোরেট কর কাঠামো পুনর্গঠনে একটি মধ্যমেয়াদি রোডম্যাপের আহ্বান জানিয়েছে বিএবি, কারণ এই অতিরিক্ত করের কারণে ব্যাংকগুলোর নিজেদের মূলধন শক্তিশালী করার ক্ষমতা খর্ব হচ্ছে। বিশেষ করে সংকটাপন্ন ও দুর্বল ব্যাংকগুলোর জন্য একটি দীর্ঘ মেয়াদের জন্য বিশেষ করপোরেট কর ছাড় দেওয়া উচিত, যাতে তাদের অর্জিত আয় বা রিটেইনড আর্নিংস দিয়ে প্রভিশন ও মূলধন ঘাটতি দ্রুত পূরণ করে ব্যালান্স শিট মেরামত করা যায়।

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির লভ্যাংশ বা ডিভিডেন্ড আয়ের ওপর পুনরায় পূর্ণ করপোরেট হারে কর ধার্য করা হলে তা পুঁজিবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকে সম্পূর্ণ নিরুৎসাহিত করবে এবং ব্যাংকগুলো শেয়ারবাজার ছেড়ে ঝুঁকিমুক্ত সরকারি সিকিউরিটিজে টাকা সরিয়ে নেবে, যা বাজার গভীর করার সরকারি লক্ষ্যের সাথে সাংঘর্ষিক। তাই বিএবি প্রাতিষ্ঠানিক ডিভিডেন্ড কর মওকুফ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের মূলধন শর্ত পূরণের জন্য ইস্যু করা স্টক ডিভিডেন্ডের ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ কর প্রত্যাহারের জোর দাবি জানিয়েছে।

ব্যাংকিং খাতের হিসাবরক্ষণ নীতির বিষয়ে বিএবি সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছে, আগামী দিনে ব্যাংকগুলোর ঋণ সুরক্ষাজনিত প্রভিশন এবং প্রভিশনিং শর্টফল বা ঘাটতির অর্থকে ট্যাক্সেবল ইনকাম বা করযোগ্য আয়ের বাইরে রাখতে হবে। যে আয় অলরেডি রেগুলেটরি প্রভিশন এবং ক্যাপিটাল রিবিল্ডিংয়ের শর্তে আটকে গেছে বা শোষিত হয়েছে, তার ওপর পুনরায় কর ধার্য করা কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়।

বাজেটের ডিজিটাল ও ক্যাশলেস সমাজ গঠনের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে ব্যাংকগুলোকে কোর ব্যাংকিং সিস্টেম, সাইবার সিকিউরিটি এবং ডেটা সেন্টারের জন্য কোটি কোটি টাকার বৈশ্বিক হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার আমদানি করতে হচ্ছে। এই ডিজিটাল ইকোসিস্টেম দ্রুত গড়ে তুলতে ব্যাংকগুলোর ব্যবহৃত সমস্ত আইটি সফটওয়্যার, হার্ডওয়্যার এবং ডিজিটাল অবকাঠামোর ওপর থেকে সব ধরনের আমদানি শুল্ক ও কর সম্পূর্ণ মওকুফ করার দাবি জানিয়েছে বিএবি, যাতে করের বাড়তি খরচে ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির গতি ধীর না হয়ে পড়ে।

বিবৃতিতে বিএবি স্পষ্ট করে মনে করিয়ে দিয়েছে, একটি শক্তিশালী ব্যাংক ছাড়া শক্তিশালী অর্থনীতি গঠন অসম্ভব, আর বিশ্বাস ছাড়া শক্তিশালী ব্যাংক টিকিয়ে রাখা যায় না। তাই কেবল সংস্কারের ঘোষণা দিলেই হবে না, তা কঠোর ডিসিপ্লিন ও অ্যাকাউন্টেবিলিটির মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে হবে। বিএবি আগামী দিনে এই প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো যথাযথভাবে অর্থবিলে অন্তর্ভুক্ত করতে সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করার পূর্ণ অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top