রপ্তানি আয়ে ৭.০৯% পতন, লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে শঙ্কা

ডিএসজে
ডিএসজে আর্কাইভ

মাসভিত্তিক সাময়িক পুনরুদ্ধারের দেখা মিললেও বছর শেষের চূড়ান্ত খতিয়ানে দেশের রপ্তানি আয়ে স্বস্তির কোনো সুযোগ নেই। বছরের ব্যবধানে চলতি মে মাসে দেশের পণ্য রপ্তানি আয় একধাক্কায় ৭.০৯ শতাংশ হারিয়ে গেছে। বিশ্ববাজারের ক্রমাগত অস্থিরতা আর দেশের ভেতরে উৎপাদন খরচের তীব্র চাপে আমাদের রপ্তানির প্রধান এই ফুসফুসটি দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির গতি ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে।

আজ বুধবার (৩ জুন) রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, চলতি বছরের মে মাসে পণ্য রপ্তানি থেকে বাংলাদেশের আয় হয়েছে ৪৪০ কোটি ২৭ লাখ ৮০ হাজার মার্কিন ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৩৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার কম। অবশ্য বছরের ব্যবধানে রপ্তানি আয় কমলেও মাসভিত্তিক হিসাবে আয় বেড়েছে। চলতি বছরের এপ্রিলের তুলনায় মে মাসে রপ্তানি আয় প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছে, যা বর্তমানের বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যেও দেশের রপ্তানিকারকদের টিকে থাকার এক অবিশ্বাস্য লড়াইকে ফুটিয়ে তুলছে।

অবশ্য মাসভিত্তিক হিসাবের এই গতিশীলতা সাময়িক খণ্ডকালীন স্বস্তি দিলেও চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসের (জুলাই–মে) সামগ্রিক খতিয়ান এখনো লাল বাতি জ্বালিয়ে রেখে বড় লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথকে কঠিন করে তুলছে। চলতি অর্থবছরে পণ্য রপ্তানি থেকে ৫ হাজার ৫০০ কোটি (৫৫ বিলিয়ন) ডলার আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবতা হচ্ছে চলতি অর্থবছরের আয় ২০২৪-২৫ অর্থবছরের চেয়েও পিছিয়ে রয়েছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-মে মেয়াদে যেখানে দেশ ৪ হাজার ৪৯৪ কোটি ডলারের পণ্য বিশ্ববাজারে পাঠিয়েছিল, সেখানে চলতি অর্থবছরের একই সময়ে সামগ্রিক রপ্তানি আয় ২.৫৫ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৩৭৯ কোটি ডলারে। সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, রিজার্ভের ক্ষয় সামাল দেওয়া এবং সরকারের নির্ধারিত এই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা ছোঁয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি এই টানা পতন নীতিনির্ধারক ও অর্থনীতিবিদদের কপালে বড় চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিয়েছে। মে পর্যন্ত অর্জিত ৪৩.৭৯ বিলিয়ন ডলারের পর, অর্থবছরের বাকি মাত্র এক মাসে পণ্য খাতের লক্ষ্যমাত্রা (৫৫ বিলিয়ন ডলার) পূরণ করা এখন প্রায় অসম্ভব এক challenge বা চ্যালেঞ্জ।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশের রপ্তানির মূল কাণ্ডারি তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতই এই বার্ষিক ধসের প্রধান শিকার হয়েছে। চলতি মে মাসে পোশাক খাত থেকে মোট ৩৫৯ কোটি ৪১ লাখ ৪০ হাজার ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা গত বছরের মে মাসের তুলনায় ৮.২৯ শতাংশ কম। যদিও আগের মাস এপ্রিলের তুলনায় ১৪.৪৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে খাতটিতে। এছাড়া চলতি অর্থবছরের জুলাই–মে মেয়াদে আরএমজি খাতের সামগ্রিক রপ্তানি আগের বছরের ৩৬.pages৫৬ বিলিয়ন ডলার থেকে ৩.৪১ শতাংশ কমে ৩৫.৩১ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে, যা পুরো খাতের ওপর তৈরি হওয়া আন্তর্জাতিক চাপের কথাই মনে করিয়ে দেয়।

একক খাত হিসেবে তৈরি পোশাকের এই বার্ষিক মন্দাভাব যখন বড় দুশ্চিন্তা তৈরি করছে, ঠিক তখনই দেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণের অপ্রচলিত উদীয়মান খাতগুলো এক দুর্দান্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। বেশ কিছু সম্ভাবনাময় খাত যেমন—ওষুধ শিল্প (ফার্মাসিউটিক্যালস), প্লাস্টিক পণ্য, পাট ও জাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল এবং প্রকৌশল পণ্য বার্ষিক ভিত্তি এবং জুলাই-মে—উভয় মেয়াদে বুক চিতিয়ে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। এর পাশাপাশি চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, ফলমূল এবং কাঁকড়া রপ্তানিও গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, যা প্রমাণ করে যে একক খাতের নির্ভরতা ভাঙার সময় এসেছে।

সার্বিক এই সংকটের মাঝেও বিশ্ববাজারে বাংলাদেশি পণ্যের ভৌগোলিক অবস্থান ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতাসক্ষমতা কিন্তু খুব একটা ম্লান হয়নি, যা লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের লড়াইয়ে আশা জিউয়ে রাখছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই–মে মেয়াদে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে। একই সাথে ইউরোপ ও এশিয়ার প্রধান প্রধান অর্থনৈতিক পাওয়ারহাউস যেমন—স্পেন, নেদারল্যান্ডস, পোল্যান্ড, কানাডা, চীন, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবেও এই ১১ মাসে ভালো প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে, যা বৈশ্বিক মন্দার মধ্যেও দেশের দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্য সক্ষমতার এক শক্তিশালী বিজ্ঞাপন।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top