প্রস্তাবিত বাজেটে আবাসন খাতের তীব্র ও জোরালো দাবির পরও কালোটাকা বা অপ্রদর্শিত আয় বিনা প্রশ্নে বৈধ করার কোনো সুযোগ দেওয়া হয়নি বলে স্পষ্টভাবে দাবি করেছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান। শনিবার রাজধানীর পল্টনে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) অডিটোরিয়ামে আয়োজিত ‘অর্থবিল বিশ্লেষণ ২০২৬–২৭’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি সরকারের এই নীতিগত অবস্থান পরিষ্কার করেন।
এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, সমাজের সৎ করদাতাদের মনে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি করে এমন কোনো অনৈতিক ধারা এবার বাজেটে রাখা হয়নি। অতীতের বিশেষ করের সুবিধা সৎ করদাতাদের প্রতি চরম অন্যায় ও বৈষম্যমূলক ছিল বিধায় এবার আবাসন খাতের চাপ সত্ত্বেও সরকার কালোটাকা বৈধ করার সুযোগ না দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এর আগে গত শুক্রবার (১২ জুন) বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে অপ্রদর্শিত আয় প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেছিলেন, মৌজামূল্যে জমি কেনাবেচার ফলে অনেক সময় আইনি জটিলতায় বৈধ টাকাও কালো হয়ে পড়ে এবং সেই অপ্রদর্শিত টাকার ওপর ২০ শতাংশ কর দিয়ে সাদা করার সুযোগ আছে। এই বিধানটি গত বছর করা হয়েছিল, কেবল সেটাই এবারের অর্থবিলে বহাল আছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সরকার চাইলে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে পারে।
এনবিআর চেয়ারম্যানের এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে সেই সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপ করে বলেন, বাস্তব সত্য হলো দেশের মৌজামূল্য জমির প্রকৃত বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক কম থাকে। এবারের বাজেট প্রণয়নের ব্যস্ততায় এ জটিল বিষয়টির গভীরে গিয়ে দেখার পর্যাপ্ত সময় তারা পাননি। অর্থমন্ত্রী এটিকে একটি বিরাট কাজ হিসেবে উল্লেখ করে ঘোষণা দেন যে, জমি কেনাবেচায় কালোটাকা রোধে আগামীতে একটি পূর্ণাঙ্গ জরিপ পরিচালনা করা হবে।
রবিবার ইআরএফ সেমিনারে এনবিআর প্রধান তার সেই কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, কর ফাঁকি দেওয়া মানে দেশের ১৮ কোটি সাধারণ মানুষকে সরাসরি ঠকানো। যেখানেই রাজস্ব চুরির সুযোগ বা লিকেজ আছে, তা এবার মাঠপর্যায়ে নির্মমভাবে বন্ধ করা হবে। সম্প্রতি একটি বন্ড সুবিধাপ্রাপ্ত জালিয়াত প্রতিষ্ঠানের গুদামে কাগজের আমদানির বিপরীতে কাঁচামালের কোনো অস্তিত্ব না পেয়ে ২০০ কোটি টাকারও বেশি রাজস্ব ফাঁকি হাতেনাতে ধরা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এমন কঠোর অ্যাকশন দেশজুড়ে চলবে।
ইআরএফ সভাপতি দৌলত আক্তার মালার সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক আবুলে কাশেমের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এই সেমিনারে আরও উপস্থিত ছিলেন এনবিআরের করনীতি বিভাগের প্রথম সচিব জাফর ইমাম, শুল্ক নীতি বিভাগের প্রথম সচিব তারিক হাসান এবং মূসক বিভাগের দ্বিতীয় সচিব বদরুজ্জামান মুন্সী।
সেমিনারে এনবিআর প্রধান জানান, এবার রাজস্ব বাড়াতে শুধু করহার বাড়ানোর চেনা পথে না গিয়ে কর ফাঁকি রোধ, ডিজিটাল নজরদারি এবং করদাতার সংখ্যা বৃদ্ধির ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হচ্ছে। কারণ দেশে এখনও বিপুলসংখ্যক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান প্রকৃত কর পরিশোধ করছে না এবং অনেকে স্রেহ শূন্য বা জিরো রিটার্ন দিচ্ছেন, যা কঠোর খাতভিত্তিক ডিজিটাল নজরদারির মাধ্যমে সহজে শনাক্ত করা হবে।
সৎ করদাতাদের জন্য একটি বড় স্বস্তির খবর দিয়ে আব্দুর রহমান খান জানান, গত পাঁচ বছরে যেসব করদাতার বিরুদ্ধে কোনো অতিরিক্ত কর দাবি ওঠেনি বা কোনো ধরনের অনিয়ম ধরা পড়েনি, নতুন বাজেটে তাদের জন্য অডিটের ঝামেলা বা বাধ্যবাধকতা সম্পূর্ণ তুলে দেওয়া হয়েছে। কমপ্লায়েন্ট ট্যাক্সপেয়ারদের জন্য এটিকে বড় ধরনের নীতিগত স্বস্তি হিসেবে উল্লেখ করে তিনি আরও আশ্বস্ত করেন যে, সাধারণ মানুষের বহুল আলোচিত সঞ্চয়পত্রের ওপর নতুন করে কোনো কর বাড়ানো হয়নি। কাস্টমস ও আয়করে ব্যাপক ডিরেগুলেটরি বা নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণের পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি ভ্যাট ব্যবস্থায় অনলাইন রিটার্ন বাধ্যতামূলক করা হলেও ফরমটিকে অত্যন্ত সহজ করা হয়েছে।
করজাল বাড়াতে খুচরা বিক্রেতাদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, যেসব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কর অফিসের আওতার বাইরে আছেন, তাদের করজালে আনতে পাইকারি বিক্রেতা বা পরিবেশকদের মাধ্যমে পণ্য বিক্রির সময় প্রতি হাজার টাকায় মাত্র দুই টাকা (দশমিক ২ শতাংশ) অগ্রিম কর কেটে রাখার একটি নতুন ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে। প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য একটি ‘সহজ ভ্যাট ব্যবস্থা’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যেখানে কোনো অডিট বা জটিল হিসাবরক্ষণ থাকবে না। তারা অনলাইনে তাৎক্ষণিক নিবন্ধন নিয়ে নির্ধারিত একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের কর পরিশোধ করলেই সব ধরনের দায়মুক্ত থাকবেন এবং কোনো ভ্যাট কর্মকর্তা এসে তাদের আর হয়রানি করতে পারবেন না।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভের অবসান ঘটিয়ে এনবিআর প্রধান বলেন, আগে ঘোষিত করহার কম হলেও বিভিন্ন যৌক্তিক ব্যয় অগ্রাহ্য বা ডিসঅ্যালাউ করার কারণে কার্যকর করহার অনেক বেড়ে যেত। এবারের বাজেটে বিনিয়োগকারীদের সেই গোপন করভার বা অদৃশ্য ট্যাক্স কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে, যাতে ঘোষিত করহার ও প্রকৃত করহারের ব্যবধান কমে আসে। পাশাপাশি রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য বন্ড সুবিধা ব্যাপক সম্প্রসারণ করা হয়েছে, যার ফলে এখন শুধু পোশাক খাত নয়, যেকোনো রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান বন্ড লাইসেন্স নিতে পারবে এবং ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুযোগ পাবে। এ ছাড়া আন্তঃকমিশনারেট পর্যায়ে কনটিনিউয়াস বন্ড সুবিধা চালু করা হয়েছে।
তামাক খাতে প্রায় ১৫ শতাংশ রাজস্ব ফাঁকি বন্ধ করতে এবং কয়েক হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করতে স্ট্যাম্পে কিউআর কোড বা উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনার কথা জানান এনবিআর চেয়ারম্যান। এর মাধ্যমে ভোক্তারা মোবাইল ফোনে স্ক্যান করেই জানতে পারবেন পণ্যটির ভ্যাট পরিশোধ করা হয়েছে কি-না এবং যারা কর ফাঁকির সঠিক তথ্য দেবেন, তাদের বড় অঙ্কের পুরস্কার দেওয়া হবে। এ ছাড়া করদাতার আস্থা ফেরাতে রিফান্ড বা কর ফেরত ব্যবস্থাকে আরও সহজ করতে রিটার্ন জমার শুরুতেই ব্যাংক হিসাবের তথ্য নেওয়া হবে, যাতে রিফান্ড সরাসরি অ্যাকাউন্টে চলে যায়।













