ইসলামী ব্যাংকে দৈনিক ঘাটতি প্রায় ১২০০ কোটি টাকা

Web Photo Card June 14 2026 IslamicBankLiquidityCrisis
ডিএসজে কোলাজ

পরিচালনা পর্ষদে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে গ্রাহকদের মাঝে তৈরি হওয়া অসন্তোষে দেশের বেসরকারি খাতের সবচেয়ে বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠান—ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি থেকে আমানত তুলে নেওয়ার হিড়িক পড়েছে। দেশজুড়ে ব্যাংকটির বিভিন্ন শাখায় গ্রাহকদের টানা দীর্ঘ লাইন এবং আতঙ্কিত উইথড্রয়ালের কারণে গত দুই কর্মদিবসে দৈনিক গড় নেট ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১০০ থেকে ১২০০ কোটি টাকা।

এমন চরম ও নজিরবিহীন তারল্য সংকটের মুখে পড়ে ব্যাংকটি যখন খাদের কিনারে, তখন তাকে টেনে তুলতে দুই দফায় ২ হাজার ৬৭০ কোটি টাকার জরুরি নগদ বা আপদকালীন তারল্য সহায়তা দিয়ে রক্ষাকবচ তৈরি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

রবিবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে গভর্নর ড. মো. মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে ইসলামী ব্যাংকের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের এক অত্যন্ত জরুরি ও দীর্ঘ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে উপস্থিত সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে উদ্ভূত মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি, ব্যাংকের ভেতরের তারল্যচিত্র এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেওয়া নানা উদ্ধারকারী পদক্ষেপের বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত করেন ব্যাংকটির ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলতাফ হুসাইন। এই রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিনির্ধারক ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত থেকে ব্যাংকটির বর্তমান নগদ প্রবাহ এবং আন্তঃব্যাংক ক্লিয়ারিং ব্যবস্থার যাবতীয় বিশ্লেষণমূলক তথ্য নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করেন।

ভারপ্রাপ্ত এমডি আলতাফ হুসাইন গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে বৈঠককে অত্যন্ত সফল ও ফলপ্রসূ আখ্যা দিয়ে বলেন, সাধারণ গ্রাহকদের জমানো টাকার চাহিদা মেটানোসহ যাবতীয় ব্যাংকিং ও পেমেন্ট গেটওয়ে সেবা স্বাভাবিক রাখতে গভর্নর সুনির্দিষ্ট নীতিগত নির্দেশনা দিয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার হঠাৎ চাপ বাড়ায় ব্যাংকের মূল চেক ক্লিয়ারিং ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত ও ধীরগতির শিকার হলেও রবিবার সকাল থেকে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে।

গ্রাহকদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজবে কান না দেওয়ার ও আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি আশ্বস্ত করেন যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই বিপুল তারল্য সহায়তার ফলে এখন থেকে সব শাখা থেকে চাহিদামতো টাকা তুলতে পারবেন আমানতকারীরা।

দৈনিক এক হাজার ২০০ কোটি টাকার বিশাল নেট ঘাটতির পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যাখ্যা দিয়ে ব্যাংক প্রধান বলেন, শাখাগুলোতে দৈনিক নতুন নগদ জমা বা ডিপোজিটের পরিমাণ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে, বিপরীতে নগদ উত্তোলনের (উইথড্রয়াল) হার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। এই দুইয়ের মধ্যকার ব্যবধান বা মিসম্যাচ আকাশচুম্বী হওয়ার কারণেই মূলত দৈনিক নেট ঘাটতি এই রেকর্ড অঙ্কে ঠেকেছে। তবে সব দিন পরিস্থিতি একরকম ছিল না, গত সপ্তাহের কোনো কোনো দিন এই ঘাটতি ৭০০ থেকে ৯০০ কোটি টাকার ঘরেও ওঠানামা করেছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তাৎক্ষণিক ক্যাশ সাপোর্টের পর আরটিজিএস এবং এনপিএসবি এর মতো অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বড় অঙ্কের কর্পোরেট ও প্রাতিষ্ঠানিক লেনদেন সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে।

এক দিনে সাধারণ ও অনলাইন মাধ্যমে বড় অঙ্কের তারল্য স্থানান্তরের কারণে ব্যাংকটির বহুল ব্যবহৃত এবং জনপ্রিয় অ্যাপভিত্তিক ডিজিটাল সেবা ‘সেলফিন’ -এ সাময়িক কারিগরি ওভারলোড ও জটিলতা দেখা দিয়েছে। তবে আইটি টিম এটি দ্রুত মেরামতে কাজ করছে এবং গ্রাহকদের সুবিধার্থে সারা দেশের এটিএম বুথগুলোতে পর্যাপ্ত নগদ টাকা ফিড বা সরবরাহ রাখা হয়েছে বলে দাবি করেন এমডি।

তিনি তহবিলের হিসাব দিয়ে জানান, রবিবার কার্যদিবসের শুরুতে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথমে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং পরবর্তীতে গ্রাহকসেবা সচল রাখতে আরও ১৭০ কোটি টাকা নগদ সহায়তা দিয়েছে, যার মোট পরিমাণ ২৬৭০ কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই বিশেষ আপদকালীন তহবিল কোন কোন শাখায় এবং কীভাবে বিতরণ ও ব্যয় করা হচ্ছে, তা কঠোরভাবে মনিটরিং ও অডিট করছে।

অন্য ব্যাংকে অনলাইন বা ইলেকট্রনিক উপায়ে ফান্ড ট্রান্সফারের বিষয়ে আলতাফ হুসাইন বলেন, ইসলামী ব্যাংকের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ এক অ্যাকাউন্ট থেকে অন্য অ্যাকাউন্টে ফান্ড স্থানান্তরে কোনো সমস্যা নেই। তবে ইন্টারব্যাংক বা অন্য ব্যাংকে টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রে গ্রাহকদের সুরক্ষার স্বার্থে আগে থেকেই একটি সীমা বা লিমিট সেট করা ছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ইসলামী ব্যাংকের ইন্টারব্যাংক ক্লিয়ারিং অ্যাকাউন্ট পজিটিভ বা ইতিবাচক ধারায় ফিরে আসায় ব্যাংকের কারিগরি দল এখন এই লিমিট বা সীমা আপডেট ও বাড়ানোর কাজ করছে, যা দ্রুতই ডিজিটাল ট্রানজেকশনকে স্বাভাবিক করে তুলবে। এছাড়া দেশের অন্যতম প্রধান রেমিট্যান্স আহরণকারী ব্যাংক হওয়ায় প্রবাসী আয়ের টাকা পরিশোধের বিষয়টিকে ব্যাংক প্রশাসন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

এদিকে ব্যাংকিং খাতের মাঠপর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশের বেসরকারি খাতের সর্ববৃহৎ এই ব্যাংকে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে খুরশীদ আলমকে নিয়োগ দেওয়ার পর থেকেই আমানতকারীদের মনে নতুন করে এক ধরনের অস্থিরতা ও অনাস্থা তৈরি হয়। এর সরাসরি প্রভাবে গত সপ্তাহ থেকেই বিভিন্ন শাখায় গ্রাহকেরা চাহিদামতো টাকা না পেয়ে খালি হাতে ফিরে যাওয়ার খবর ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, যা মূলত রবিবার এই আতঙ্কিত প্রত্যাহারের হিড়িক তৈরি করে।

তবে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাথে নিয়মিত সমন্বয়ের মাধ্যমে সাময়িক এই অনাকাঙ্ক্ষিত সংকট অনেকটাই স্বাভাবিকের পথে এবং সামগ্রিক তারল্য পরিস্থিতি ধীরে ধীরে পজিটিভ বা ইতিবাচক জোনে ফিরে আসছে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top