পরিচালনা পর্ষদ গঠন ও নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে লাগাতার আন্দোলন, গ্রাহকদের আমানত প্রত্যাহারের হিড়িক এবং তীব্র তারল্য সংকটের মুখে অবশেষে দেশের ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির পরিচালনা পর্ষদ সম্পূর্ণ বাতিল ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সাথে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ও যাবতীয় কার্যক্রম পুরোপুরি স্বাভাবিক করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক (ইডি) জহির হোসেনকে ব্যাংকটির ‘প্রশাসক’ হিসেবে নিয়োগ দিয়ে সব ধরনের প্রশাসনিক ও নীতিনির্ধারণী ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়েছে।
রবিবার (১৪ জুন) রাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের উচ্চপর্যায়ের এক জরুরি সিদ্ধান্ত শেষে বেসরকারি খাতের সবচেয়ে বড় ব্যাংকটি নিয়ে এমন পদক্ষেপের তথ্য নিশ্চিত করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। সম্প্রতি ব্যাংকটিতে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পর থেকেই আমানতকারীদের মধ্যে তীব্র অনাস্থা তৈরি হয়, যার ফলে গত কয়েক কর্মদিবসে ব্যাংকটি থেকে লাইন ধরে টাকা তোলার হিড়িক পড়ে এবং দৈনিক গড়ে ১১০০ থেকে ১২০০ কোটি টাকার রেকর্ড নেট ঘাটতি দেখা দেয়।
এই ব্যাপক আমানত প্রত্যাহারের চাপ সামলাতে আজ সকালেই ইসলামী ব্যাংককে দুই দফায় ২ হাজার ৬৭০ কোটি টাকার আপদকালীন বিশেষ তারল্য সহায়তা বা ক্যাশ সাপোর্ট দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু কেবল নগদ টাকা ঢেলে গ্রাহকদের আতঙ্ক এবং মাঠপর্যায়ের ব্যবস্থাপনার ধস ঠেকানো সম্ভব হচ্ছিল না বিধায় আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা ও ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে শেষ পর্যন্ত পুরো পর্ষদই ভেঙে দেওয়ার এই চূড়ান্ত ও কঠোর সিদ্ধান্ত নিল নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
মূলত ২০১৭ সালে শেয়ারবাজার থেকে নামে–বেনামে শেয়ার কিনে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ ও বিতর্কিত শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপ ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেয়, যেখানে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই) সহায়তা করেছিল বলে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র–জনতার গণ–অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ব্যাংকটি এস আলমের নিয়ন্ত্রণমুক্ত হয় এবং তখন থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধিরাই ব্যাংকটি পরিচালনা করছিলেন। বর্তমানে ইসলামী ব্যাংকের ৫০ শতাংশের বেশি ঋণই খেলাপি হয়ে পড়েছে, যার সিংহভাগ নামে–বেনামে তুলে নিয়েছে খোদ এস আলম গ্রুপ।
চলতি সংকটের সূত্রপাত হয় গত ২৪ মে পবিত্র ঈদুল আজহার আগের শেষ কর্মদিবসে, যখন ইসলামী ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান এম জুবায়দুর রহমান হঠাৎ পদত্যাগ করেন। এরপর ওই দিনই রাত ৯টায় এক জরুরি সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে ব্যাংকটির স্বতন্ত্র পরিচালক ও নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু ব্যাংকটিতে চেয়ারম্যানসহ যে পাঁচজন পরিচালক ছিলেন, তারা সবাই বাংলাদেশ ব্যাংকেরই নিয়োগ করা স্বতন্ত্র পরিচালক হওয়া সত্ত্বেও এই নতুন নিয়োগ নিয়ে ব্যাংকটির ভেতরে-বাইরে তীব্র বিতর্ক ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে।
খুরশীদ আলমের নিয়োগের পর থেকেই তাঁর অপসারণসহ সাত দফা দাবিতে ‘সচেতন গ্রাহক ফোরামের’ ব্যানারে একদল গ্রাহক ও কর্মকর্তা টানা আন্দোলন শুরু করেন। এমনকি আজ সকালেও আন্দোলনকারীরা ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন এবং আগামী মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নরের কাছে স্মারকলিপি জমা দেওয়ার আলটিমেটাম ঘোষণা করেছেন। এই অস্থিরতা ও নিয়োগ বিতর্ক নিয়ে দেশের জাতীয় সংসদেও সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের মধ্যে তুমুল আলোচনা ও সমালোচনা হয়, যা সাধারণ গ্রাহকদের মাঝে আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে দেয়।
বিদ্যমান পরিস্থিতি সামাল দিতে ও গ্রাহক আস্থার পতন ঠেকাতে শুরুতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে এককালীন ১০ হাজার কোটি টাকা জরুরি ধার চেয়েছিল ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। কিন্তু ব্যাংকটির আর্থিক স্বাস্থ্য ও আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটায় শেষ পর্যন্ত ২ হাজার ৬৭০ কোটি টাকার তারল্য সহায়তার পাশাপাশি পুরো পর্ষদ বাতিল করে প্রশাসক শাসনের অধীনে নেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নতুন প্রশাসক জহির হোসেন এখন থেকে একক ক্ষমতার ভিত্তিতে ব্যাংকের দৈনিক লেনদেন স্বাভাবিক করা ও আমানতকারীদের আস্থা ফেরাতে কাজ করবেন।













