দেশে চলমান তীব্র অর্থনৈতিক মন্দা, লাগামহীন উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং সাধারণ মানুষের ক্ষয়িষ্ণু সঞ্চয় ক্ষমতার বিপরীত পিঠে দাঁড়িয়ে দেশের ব্যাংক খাতে কোটিপতি আমানতকারীদের সংখ্যা ও তাঁদের জমানো টাকার পাহাড় জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসেই (জানুয়ারি-মার্চ) দেশের ব্যাংকিং খাতে নতুন করে কোটিপতি হিসাব যুক্ত হয়েছে ২ হাজার ৪৪১টি। এর ফলে দেশের ব্যাংকব্যবস্থায় এই অতি-অভিজাত হিসাবের মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৪৮৫টিতে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন থেকে কোটিপতি হিসাবধারীর এমন পরিসংখ্যান পাওয়া গেছে।
অর্থনীতিবিদেরা এই প্রবণতাকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক আখ্যা দিয়ে বলছেন, সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় যখন ক্রমাগত কমছে, তখন একটি নির্দিষ্ট ও ক্ষুদ্র শ্রেণির হাতে এভাবে বিপুল অর্থ পুঞ্জীভূত হওয়া দেশের ক্রমবর্ধমান চরম অর্থনৈতিক বৈষম্যকেই প্রমাণ করে। এটি মূলত মুদ্রাস্ফীতির বাজারেও কিছু বিশেষ খাতের নজিরবিহীন রেকর্ড ও একচেটিয়া মুনাফা তৈরির একটি বিপজ্জনক চিত্রকে সুকৌশলে ফুটিয়ে তোলে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকাশিত ডেটা ও পরিসংখ্যান খতিয়ে দেখলে স্পষ্ট বোঝা যায়, এই তিন মাসে শুধু কোটিপতি হিসাবের সংখ্যাই বাড়েনি, বরং সাধারণ আমানতকারীদের তুলনায় এই অবলীলাক্রমে ধনী হওয়া অ্যাকাউন্টগুলোতে টাকা জমার গতি ও প্রবণতা ছিল অনেক বেশি তীব্র ও আগ্রাসী।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে কোটি টাকার এসব হিসাবে জমানো টাকার মোট স্থিতি যেখানে ছিল ৮ লাখ ৩৬ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা, সেখানে মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে মার্চ শেষে তা আরও ২২ হাজার ৭৯২ কোটি টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৫৯ হাজার ১৬২ কোটি টাকায়। অথচ একই সময়ে দেশের সামগ্রিক ব্যাংক খাতের মোট আমানত ২১ লাখ ৫৩৩ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২১ লাখ ৫৮ হাজার ২৪ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। এর অর্থ হলো, দেশের পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার মোট আমানতের একটি বিশাল এবং সিংহভাগ অংশই এখন মাত্র ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটিপতি হিসাবের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।
অবশ্য ব্যাংক খাতের কোটি টাকার হিসাব মানেই সেটি কেবল একক কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত ‘কোটিপতি’ হওয়ার একক শংসাপত্র বা দলিল নয়। কারণ ব্যাংকে এক কোটি টাকার বেশি আমানত বা স্থিতি রাখার এই তালিকায় ব্যক্তি-মালিকানার হিসাবধারী বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি এবং সরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। তাছাড়া বিদ্যমান নিয়মে বাংলাদেশে একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কতটি ব্যাংক হিসাব খুলতে পারবেন, তার আইনগত কোনো নির্দিষ্ট সীমাও নেই।
তবে সামগ্রিক ব্যাংক হিসাব খোলার গ্রাফ ও এর গতিপ্রকৃতি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, জীবনের কঠিন তাগিদে বা প্রান্তিক পর্যায়ে কিছুটা বাধ্য হয়েই ক্ষুদ্র সঞ্চয়ের এক ধরনের প্রবণতা সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছুটা বেড়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে মোট হিসাবের সংখ্যা যেখানে ছিল ১৭ কোটি ৭৯ লাখ ৫০ হাজার ৪৬৫টি, সেখানে এই তিন মাসে তা ৪৬ লাখ ৬১ হাজার ৫৫০টি বেড়েছে।
এর ফলে চলতি বছরের মার্চ শেষে দেশের ব্যাংক খাতের মোট হিসাব সংখ্যা এক লাফে দাঁড়িয়েছে ১৮ কোটি ২৬ লাখ ১২ হাজার ১৫টিতে। কিন্তু আমানতের আনুপাতিক হিসাবের বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, নতুন লাখ লাখ সাধারণ হিসাব সিস্টেমে যুক্ত হলেও ব্যাংকের মূল তারল্যের আসল প্রবৃদ্ধি ও নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি ধরে রাখছে ওই শীর্ষ স্তরের কোটিপতি হিসাবগুলোই।
স্বাধীনতার পর থেকে দেশের এই বিশেষ আমানতকারীদের উত্থান ও বাড়বাড়ন্তের ইতিহাস গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কোটিপতি হিসাবের এই উল্লম্ফন মূলত গত দেড় দশকেই সবচেয়ে বেশি লাগামহীন ও অনিয়ন্ত্রিত হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, ১৯৭২ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে কোটি টাকার আমানতকারী ছিল মাত্র ৫ জন।
এরপর ১৯৭৫ সালে তা ৪৭ জন এবং আশির দশকে অর্থাৎ ১৯৮০ সালে তা ৯৮ জনে পৌঁছায়। নব্বইয়ের দশকে দেশে মুক্তবাজার অর্থনীতি ও বেসরকারীকরণ চালুর পর ১৯৯০ সালে এই সংখ্যা ৯৪৩টি এবং ১৯৯৬ সালে ২ হাজার ৫৯৪টি ছাড়ায়। এরপর ২০০১ সালে ৫ হাজার ১৬২টি এবং ২০০৬ সালে তা ৮ হাজার ৮৮৭টিতে গিয়ে ঠেকে, যা ২০০৮ সালে ছিল ১৯ হাজার ১৬৩টি।
তবে এই পুরো গ্রাফের আসল ও অবিশ্বাস্য ম্যাজিক উল্লম্ফন ঘটে পরবর্তী সময়গুলোতে, যেখানে দেখা যায় আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০০৯ থেকে ২০২০ সাল শেষে এই এলিট সংখ্যা এক লাফে ৯৩ হাজার ৮৯০টি পেরিয়ে যায়। এরপর ২০২১ সালে তা দাঁড়ায় ১ লাখ ৯ হাজার ৭৬টি এবং ২০২৩ সাল শেষে তা আরও বেড়ে ১ লাখ ১৬ হাজার ৯০৮টিতে পৌঁছায়।
অবশ্য ফ্যাসিবাদী আওয়ামী সরকার পতনের পর অর্থনীতির মন্দার সময়েও কোটিপতি হিসাবধারীর সংখ্যা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। গত ২০২৪ ও ২০২৫ সালের প্রতিটি প্রান্তিকে ধারাবাহিকভাবে টাকার পাহাড় গড়তে গড়তে চলতি ২০২৬ সালের মার্চে এসে এটি ১ লাখ ৩৬ হাজার ৪৮৫টির নতুন রেকর্ড মাইলফলক স্পর্শ করেছে, যা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ধনিক শ্রেণির একচেটিয়া বিকাশ ও সম্পদের চরম অসম বণ্টনকেই সর্বাগ্রে নির্দেশ করে।













