দেশে ক্যাশলেস বা ডিজিটাল পেমেন্ট ইকোসিস্টেমের দ্রুত সম্প্রসারণের সমান্তরালে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে সাইবার ঝুঁকি ও সুসংগঠিত আর্থিক জালিয়াতি। ২০২৫ সালে দেশের বিভিন্ন পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মে মোট ৮১ হাজার ৪২৩টি ডিজিটাল প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে, যার মাধ্যমে গ্রাহকদের পকেট থেকে অন্তত ৯২ কোটি ৬০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে সাইবার অপরাধীরা।
তবে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, খোয়া যাওয়া এই বিশাল অঙ্কের অর্থের মধ্যে ৮২ কোটি ৭২ লাখ টাকাই আর উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। সামগ্রিকভাবে ডিজিটাল জালিয়াতির অর্থ উদ্ধারের বা রিকভারির এই হার মাত্র ১০.৭ শতাংশ, যা দেশের উদীয়মান ডিজিটাল অর্থনীতির নিরাপত্তা ও গ্রাহক আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্ট (পিএসডি) থেকে প্রকাশিত সর্বশেষ বার্ষিক কৌশলগত মূল্যায়ন প্রতিবেদনে দেশের পেমেন্ট খাতের এই বিপজ্জনক ও ভঙ্গুর চিত্র উঠে এসেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আরটিজিএস, বিএসিএইচ, এনপিএসবি, এমএফএস এবং পিএসপিসহ আধুনিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ট্রানজেকশনের গ্রাফ যত জ্যামিতিক হারে বাড়ছে, অপরাধীদের জালিয়াত চক্রও ঠিক ততটাই শক্তিশালী হয়ে উঠছে। আর্থিক ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং গ্রাহকদের আস্থা ধরে রাখতে অবিলম্বে একটি নিরেট ‘প্রতারণা-ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামো’ বাস্তবায়ন এবং দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি বলে মনে করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
জালিয়াতির ৮৮% এমএফএস খাতে
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডিজিটাল প্রতারণার সবচেয়ে বড় বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস বা এমএফএস খাত। ২০২৫ সালে সংঘটিত মোট প্রতারণার প্রায় ৮৮ শতাংশ টাকাই হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বিকাশ, রকেট, নগদ বা উপায়ের মতো এমএফএস প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে। এই খাতে বছরজুড়ে প্রতারণার পরিমাণ ছিল প্রায় ৮১ কোটি ৩২ লাখ টাকা, যার মধ্যে ৭৪ কোটি ২৫ লাখ টাকাই উদ্ধার করা যায়নি। ফলে এমএফএস খাতে অর্থ পুনরুদ্ধারের হার ছিল মাত্র ৮.৭ শতাংশ।
ত্রৈমাসিক ডেটা বিশ্লেষণে দেখা যায়, বছরের শুরুতে জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে এমএফএস-এ প্রতারণার ঘটনা ছিল ১৬ হাজার ২৩০টি। পরবর্তী এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে তা আরও বেড়ে দাঁড়ায় ১৮ হাজার ৬২৩টিতে। বছরের প্রথম ভাগে জালিয়াতির তীব্রতা বেশি থাকলেও শেষভাগে এসে তা কিছুটা কমতে থাকে। প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া অর্থের অঙ্কও একই ধারা অনুসরণ করেছে, যেখানে বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) সর্বোচ্চ ২১ কোটি ৯৮ লাখ টাকা লোপাট করেছে সাইবার অপরাধীরা।
খাতসংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমএফএস খাতে অর্থ রিকভারি না হওয়ার মূল কারণ হলো ‘অ্যাকাউন্ট হপিং’। প্রতারকেরা চুরি করা অর্থ এক ওয়ালেটে না রেখে মুহূর্তের মধ্যে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির মাধ্যমে একাধিক অ্যাকাউন্ট এবং মধ্যবর্তী ডজনখানেক ওয়ালেটে ছড়িয়ে দেয়। ফলে ভুক্তভোগী গ্রাহক বা সংশ্লিষ্ট এমএফএস অপারেটর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেওয়ার আগেই ক্যাশ-আউটের মাধ্যমে অর্থ সিস্টেমের বাইরে চলে যায়।
এছাড়া বাজারে বিপুল সংখ্যক ফেক বা ভুয়া এমএফএস অ্যাকাউন্ট এবং নিয়ম না মেনে তোলা বেনামী সিম কার্ড ছড়িয়ে পড়ায় অপরাধীদের আসল পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। সম্প্রতি সিম কার্ডের ওপর থেকে কর প্রত্যাহারের সরকারি সিদ্ধান্তের কারণে এই ফেক সিমের বিস্তার ও প্রতারণা আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন ব্যাংকাররা।
চেক জালিয়াতি: ঘটনা কম, তবে বড় অঙ্কের ধাক্কা
এমএফএস-এর তুলনায় চেকভিত্তিক প্রথাগত লেনদেনে জালিয়াতির ধরন সম্পূর্ণ ভিন্ন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য মতে, ২০২৫ সালে দেশজুড়ে মোট ৩০টি চেক জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। ঘটনা সংখ্যায় খুবই কম হলেও প্রতিটি ঘটনার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল অনেক বড়। এই ৩০টি ঘটনাতেই প্রতারকেরা ব্যাংকগুলোর চোখ ফাঁকি দিয়ে ৮ কোটি ৫৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।
তবে এমএফএস-এর হতাশার বিপরীতে চেক জালিয়াতির অর্থ উদ্ধারে ব্যাংকগুলো অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে। ব্যাংকিং খাতের শক্তিশালী ট্র্যাকিং ও আইনি কড়াকড়ির কারণে হাতিয়ে নেওয়া অর্থের প্রায় ৮১ শতাংশই (প্রায় ৬ কোটি ৯২ লাখ টাকা) পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে, যা তিন ধরনের পেমেন্ট চ্যানেলের মধ্যে সর্বোচ্চ।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, চেক জালিয়াতি বর্তমানে সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থার জন্য বড় হুমকি না হলেও, অল্প কয়েকটি ঘটনাও যেকোনো ব্যাংকের বড় আর্থিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই শাখা পর্যায়ে ম্যানুয়াল ভেরিফিকেশন বা যাচাই প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী করা, চেক বিশ্লেষণে আধুনিক ইমেজভিত্তিক প্রযুক্তি (এমআইসিআর/সিটিএস) ব্যবহার এবং দ্বৈত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদার করার সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
কার্ড জালিয়াতি: কঠোর ওটিপি ও নজরদারিতে কমেছে ঝুঁকি
ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ড লেনদেনে ২০২৫ সালে জালিয়াতির প্রবণতায় একটি বড় পতন বা ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) এ খাতে ৩ হাজার ৭৪০টি জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছিল, যেখানে কার্ড হোল্ডারদের কাছ থেকে ২ কোটি ৬৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু পরবর্তী প্রান্তিকগুলোতে ব্যাংকগুলোর কঠোর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার কারণে প্রতারণার সংখ্যা ও ক্ষতির পরিমাণ নাটকীয়ভাবে কমে যায়।
তথ্য অনুযায়ী, বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে কার্ড জালিয়াতির ঘটনা নেমে আসে মাত্র ১ হাজার ৭১৭টিতে এবং আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ কমে ৭ লাখ টাকারও নিচে চলে আসে। বছরের বাকি সময়ে এটি সামান্য বাড়লেও তা বছরের শুরুর চেয়ে অনেক কম ছিল। মূলত কার্ড লেনদেনে টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন, বাধ্যতামূলক ওটিপি ব্যবহারে কঠোরতা এবং মার্চেন্ট পর্যায়ে আধুনিক ফ্রড ডিটেকশন সফটওয়্যার ব্যবহারের কারণে এই সফলতা এসেছে। কার্ড জালিয়াতিতে অর্থ পুনরুদ্ধারের হার ছিল প্রায় ৪৭ শতাংশ, যা এমএফএসের তুলনায় অনেক বেশি হলেও চেকের তুলনায় কম।
ডিজিটাল ইকোসিস্টেমের এই বিশাল লিকেজ ও জালিয়াতি বন্ধে বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের প্রতিবেদনে তিন খাতের জন্য সুনির্দিষ্ট ৯টি কৌশলগত সুপারিশ বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছে। প্রথমত, এমএফএস খাতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ বা অস্বাভাবিক বড় লেনদেনের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক ‘কোলিং-অফ’ সময়সীমা চালু করার কথা বলা হয়েছে, যাতে নির্দিষ্ট সময়ের আগে টাকা ক্যাশ-আউট না হতে পারে। একই সাথে দেশের সব পিএসপি ও এমএফএস-কে যুক্ত করে একটি ‘কেন্দ্রীয় প্রতারণা নিবন্ধন’ গঠন এবং এক অপারেটর থেকে অন্য অপারেটরে টাকা পাঠানো মাত্রই জালিয়াতি চিহ্নিত হলে রিয়েল-টাইম আন্তঃঅপারেটর ওয়ালেট ফ্রিজিং ব্যবস্থা চালু করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, চেকভিত্তিক লেনদেনের ঝুঁকি কমাতে ব্যাংকের শাখাগুলোতে আধুনিক চেক প্রমাণীকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার, আগাম নোটিশ ছাড়াই এলোমেলোভাবে শাখা পর্যায়ে অডিট পরিচালনা এবং অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি মূল্যায়ন কাঠামো জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া কার্ডভিত্তিক লেনদেনের নিরাপত্তা বাড়াতে এআই চালিত ‘ফ্রড স্কোরিং মডেল’ ব্যবহার সম্প্রসারণ, ই-কমার্সের আড়ালে সীমান্তপার বা আন্তর্জাতিক লেনদেনের ওপর কঠোর নজরদারি এবং মার্চেন্ট অনবোর্ডিংয়ের ক্ষেত্রে কেওয়াইসি যাচাই প্রক্রিয়া আরও নিখুঁত করার ওপর বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, “ডিজিটাল পেমেন্ট সেফটি নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তদারকি বহুগুণ জোরদার করেছে। আমাদের পেমেন্ট সিস্টেমস সুপারভিশন বিভাগ এখন প্রতিনিয়ত মাঠপর্যায়ে এবং ডিজিটালি নমুনাভিত্তিক নিবিড় পরিদর্শন পরিচালনা করছে।”
তিনি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্ক করে বলেন, “এমএফএস অপারেটররা যদি নিজেদের প্রযুক্তি উন্নত করে এই প্রতারণার গ্রাফ নামিয়ে আনতে না পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে তাদের ব্যবসায়িক সুনাম ও গ্রাহক আস্থা ধসে পড়বে এবং তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বর্তমানে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এবং সিআইডি-সহ সব আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা আর্থিক অপরাধ মোকাবিলায় একসঙ্গে কাজ করছে। কিছু সুসংগঠিত অপরাধী চক্র এখনও সক্রিয় থাকার চেষ্টা করছে, তবে আশার কথা হলো—দেশে দৈনিক যে হাজার হাজার কোটি টাকার ডিজিটাল লেনদেন হচ্ছে, সেই সামগ্রিক ভলিউমের তুলনায় প্রতারণার এই হার এখনও অনেক কম এবং আমাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।”













