বিগত ৫ আগস্টের পটপরিবর্তন ও রাজনৈতিক ডামাডোল শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতের ওপর আবারও আস্থা ফিরতে শুরু করেছে সমাজের প্রান্তিক ও স্বল্প আয়ের মানুষের। গত এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকগুলোতে ১০, ৫০ ও ১০০ টাকা দিয়ে খোলা নো-ফ্রিলস অ্যাকাউন্টে (এনএফএ) আমানতের পরিমাণ বেড়েছে ৫১৯ কোটি টাকা বা ১০ দশমিক ৬০ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ২০২৬ সালের মার্চ প্রান্তিকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে সারা দেশে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর এসব প্রতিটি ব্যাংক হিসাবে গড়ে সঞ্চয় বা জমার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮৪৪ টাকা করে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত বছরের ৫ আগস্টের পর কয়েক মাস দেশে ব্যাপক রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজ করলেও পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন সংস্কারমুখী পদক্ষেপের কারণে ব্যাংক খাতে মানুষের ভরসা বাড়ে। তবে অতি সম্প্রতি ব্যাংকিং খাতে নতুন করে যে অস্থিরতা ও পর্ষদ ভাঙার খেলা তৈরি হয়েছে, তা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে প্রান্তিক মানুষের আমানত রাখার এই গতি মারাত্মকভাবে কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চ শেষে স্বল্প আয়ের মানুষের এই বিশেষ ব্যাংক হিসাবগুলোতে আমানতের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকা, যা চলতি ২০২৬ সালের মার্চ শেষে ৫ হাজার ৪০৭ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। কেবল এক বছরের ব্যবধানেই নয়, গত তিন মাসের (জানুয়ারি-মার্চ) ব্যবধানেও আমানত বেড়েছে ২৯১ কোটি টাকা বা ৫ দশমিক ৪৮ শতাংশ; কারণ ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এই আমানত ছিল ৫ হাজার ১১৬ কোটি টাকা।
আমানতের পাশাপাশি এক বছরে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ব্যাংক হিসাব বা অ্যাকাউন্টের সংখ্যা বেড়েছে রেকর্ড ১০ লাখ ৮০ হাজার ১১৯টি। ২০২৫ সালের মার্চ শেষে ব্যাংকগুলোতে নো-ফ্রিল অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৮২ লাখ ৩৬ হাজার ৭৭০টি, যা চলতি বছরের মার্চ শেষে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৭১ লাখ ১৬ হাজার ৮৮৯টিতে। অন্যদিকে, গত ডিসেম্বর শেষের ২ কোটি ৯২ লাখ ৩২ হাজার ৫৭০টি অ্যাকাউন্টের তুলনায় গত তিন মাসে হিসাব বেড়েছে ৮৪ হাজার ৩১৯টি।
২০১০ সাল থেকে সমাজের সব স্তরের মানুষের আর্থিক সেবা ও অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে ন্যূনতম ব্যালেন্স ও কোনো ধরনের সার্ভিস চার্জ বা ফি ছাড়া এই নো-ফ্রিলস অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ করে দেয় সরকার। স্কুল ব্যাংকিং ও কর্মজীবী শিশুদের অ্যাকাউন্ট বাদে এই হিসাবগুলোতে সাধারণ সঞ্চয়ী হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি হারে সুদ দেওয়া হয়। কৃষক, পোশাক শ্রমিক, অতি দরিদ্র এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধাভোগীরা মূলত এই ব্যাংকিং সুবিধার প্রধান অংশীদার।
মার্চ শেষে খাতভিত্তিক আমানতের চিত্রে দেখা যায়, কৃষকদের সঞ্চয় ৮০৮ কোটি থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৬৩ কোটি টাকায়। পোশাকশ্রমিকদের আমানত ৪৭৬ কোটি থেকে বেড়ে হয়েছে ৫০৬ কোটি এবং সামাজিক সুরক্ষার সুবিধাভোগীদের আমানত ১ হাজার ৮০৭ কোটি থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯০২ কোটি টাকায়। তবে এই সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের আমানত ৯৯১ কোটি থেকে সামান্য কমে ৯৯০ কোটি এবং অতি দরিদ্রদের আমানত ৩৪৭ কোটি থেকে কমে ২৭৭ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।
প্রান্তিক মানুষের এই হিসাবগুলোর মাধ্যমে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় আসার পরিমাণও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। তথ্য অনুযায়ী, গত ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এসব হিসাবের মাধ্যমে আসা মোট প্রবাসী আয়ের পরিমাণ ছিল ৮২৬ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। চলতি বছরের মার্চ শেষে মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে তা ১৮ কোটি ২৪ লাখ টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৪৫ কোটি ১৭ লাখ টাকায়।













