মাঠের বাস্তবতার সাথে মেলেনি অর্থমন্ত্রীর হিসাব

DSJ Web Photo June 12 2026 CPDBudgetAnalysis
ছবি: সিপিডির পেজ থেকে নেওয়া

দেশের চলমান তীব্র অর্থনৈতিক সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ডলারের টানাপোড়েনের বাস্তবতাকে আড়াল করে সরকার আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য যে বিশাল বাজেট প্রস্তাব করেছে, তার সামষ্টিক অর্থনৈতিক ভিত্তি নিয়েই এবার গুরুতর ও মৌলিক প্রশ্ন তুলেছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির মতে, নতুন বাজেটের অন্তর্নিহিত দর্শন ও সামাজিক সুরক্ষার উদ্দেশ্যগুলো ইতিবাচক হলেও এর মূল প্রাক্কলন ও লক্ষ্যমাত্রাগুলো এমন একটি অলৌকিক ও দুর্বল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যার সাথে বাস্তব অর্থনীতির কোনো মিল নেই।

ফলে প্রায় পৌনে ৭ লাখ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় এবং সাড়ে ৭ শতাংশে মূল্যস্ফীতি নামিয়ে আনার এই রূপান্তরমূলক বাজেট পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন করাই নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ও চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে। শনিবার ১২ জুন রাজধানীর গুলশানের লেকশোর হোটেলে আয়োজিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: সিপিডির পর্যালোচনা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান এবং নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন এই বিশদ মূল্যায়ন তুলে ধরেন।

সিপিডির মতে, বাজেট প্রাক্কলনের জন্য সরকার চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে রপ্তানি, রাজস্ব আদায় এবং বেসরকারি খাতের ঋণে একটি কাল্পনিক ও অলৌকিক ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে ধরে নিয়ে আগামী বছরের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। বাস্তবে মাঠপর্যায়ের সামষ্টিক অর্থনীতির কোনো সূচকেই এমন আকস্মিক চাঞ্চল্যকর পরিবর্তনের সুস্পষ্ট কোনো ভিত্তি বা লক্ষণ নেই।

সংস্থাটি তথ্য দিয়ে দেখায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি যেখানে ঋণাত্মক ১ দশমিক ৮ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থান করছে, সেখানে কোনো বাস্তব ভিত্তি ছাড়াই আগামী অর্থবছরে ৮ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। একইভাবে মূল্যস্ফীতি এখনও ৯ শতাংশের ওপরে স্থায়ীভাবে অবস্থান করলেও বাজেটে তা জাদুকরিভাবে সাড়ে ৭ শতাংশে নেমে আসার প্রত্যাশা করা হয়েছে। বর্তমান সরকার অর্থনীতির নানা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে। তাই বাস্তবতা স্বীকার করে আরও সতর্ক ও বাস্তবসম্মত ভিত্তির ওপর বাজেট প্রণয়ন করা হলে এর বিশ্বাসযোগ্যতা ও বাস্তবায়ন সক্ষমতা অনেক বাড়ত।

রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অর্জন করতে হলে আগামী এক বছরে রাজস্ব আহরণে অন্তত ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বিস্ফোরক প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন হবে। কর-শুল্ক ছাড় ও বিভিন্ন প্রণোদনা দিয়ে বিনিয়োগ বাড়ানোর যে কৌশল বাজেটে নেওয়া হয়েছে, তার সুফল রাজস্বে প্রতিফলিত হতে দীর্ঘ সময় লাগবে। ফলে এক বছরের মধ্যে এই বিশাল রাজস্ব না এলে এবং সরকারি ব্যয় অপরিবর্তিত থাকলে, ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর সরকারের ক্ষতিকর নির্ভরতা আরও বহুগুণ বেড়ে যাবে।

বৈদেশিক ঋণ পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সিপিডি জানায়, গত বছর বৈদেশিক ঋণ পরিশোধেই দেশটিকে প্রায় ৭০০ কোটি ডলার ব্যয় করতে হয়েছে। মেগা প্রকল্পগুলোর ঋণের রেয়াতকাল শেষ হয়ে যাওয়ায় এখন শুধু সুদ নয়, আসল অর্থও বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধ করতে হচ্ছে। অথচ এসব প্রকল্প থেকে আয় হচ্ছে দেশীয় মুদ্রায়। ফলে টাকার অবমূল্যায়ন হলে ঋণের প্রকৃত বোঝা আরও বেড়ে যায় এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চরম চাপ সৃষ্টি হয়। ঘাটতি অর্থায়নের জন্য অতিরিক্ত অর্থ ছাপানো হলে তা মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে।

বাজেটে ক্ষুদ্র ও মাঝারি (এসএমই) খাতের বন্ড সুবিধা, ব্যাংক গ্যারান্টি, সামাজিক সুরক্ষা এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে শুল্ক ছাড়ের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেছে সিপিডি। তবে ড. মোস্তাফিজুর রহমান স্পষ্ট করেন, শুধু কর-শুল্ক সুবিধা বা ‘সিঙ্গেল উইন্ডো’ চালু করলেই দেশে বিনিয়োগ বাড়বে না। বিনিয়োগকারীদের জন্য যতক্ষণ পর্যন্ত গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এবং আইনশৃঙ্খলা ও কার্যকর সেবা নিশ্চিত না করা যাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত কাঙি্ক্ষত বিনিয়োগ আসবে না। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার আমূল সংস্কার ছাড়া এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী বাজেট মুখ থুবড়ে পড়বে।

স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দের রেকর্ড উল্লম্ফনকে স্বাগত জানালেও এই অর্থ কার্যকরভাবে ব্যয় করার মতো সক্ষমতা ও সুশাসন সরকারের আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে কারিগরি শিক্ষা ও বিদেশি ভাষা শিক্ষার উদ্যোগ প্রশংসনীয় হলেও এর জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষক, প্রশিক্ষক ও অবকাঠামো এক বছরের মধ্যে তৈরি করা অসম্ভব। বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রেক্ষাপটে ব্যক্তি করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকার চেয়ে আরও বেশি বাড়ানো উচিত ছিল, কারণ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর করের বোঝা এখনও অত্যন্ত বৈষম্যমূলক।

বাজেটে বিনা প্রশ্নে কালোটাকা বা অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার সুযোগের তীব্র ও কড়া সমালোচনা করেছে সিপিডি। ড. মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, এটি অর্থনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ যুক্তিসংগত নয়, নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয় এবং রাজনৈতিকভাবেও সমাজে কোনো ইতিবাচক বার্তা দেয় না। এটি সৎ করদাতাদের কর প্রদানে চরমভাবে নিরুৎসাহিত করে এবং সমাজে করনৈতিকতার চরম অবক্ষয় ঘটায়। ড. ফাহমিদা খাতুনও যোগ করেন, কালোটাকা সাদা করার এই অনৈতিক সুযোগ করব্যবস্থায় গভীর বৈষম্য সৃষ্টি করে এবং নিয়মিত করদাতাদের প্রতি চরম অন্যায় আচরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

বাজেটের সামগ্রিক দর্শন ও দৃষ্টিভঙ্গি অনেকাংশে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করা, ব্যবসাবান্ধব নীতি ও নিয়ন্ত্রণমুক্তকরণের অঙ্গীকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও এর মূল বাধা দুর্বল বাস্তবায়ন সক্ষমতা। চলতি অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি মাত্র ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ হলেও আগামী অর্থবছরে তা ৯ দশমিক ৪ শতাংশ হবে বলে যে প্রাক্কলন করা হয়েছে, তা বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার করা ছাড়া অর্জন করা অবাস্তব। বর্তমানে জ্বালানি সংকট ও ব্যক্তি খাতের অনীহা দূর করাই বড় চ্যালেঞ্জ।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটটি কাঠামোগত সংস্কারের একটি ভালো খসড়া হলেও তা দেশের বিদ্যমান জ্বলন্ত অর্থনৈতিক বাস্তবতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। উচ্চ প্রবৃদ্ধি ও নিম্ন মূল্যস্ফীতি একসঙ্গে অর্জন করতে হলে কেবল কাগজে-কলমে লক্ষ্য নির্ধারণ না করে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়, সুশাসন এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায়, অলৌকিক প্রাক্কলনের এই মেগা বাজেট সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাস আর সামষ্টিক অর্থনীতির চাপ আরও বাড়িয়ে দেবে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top