দেশের পুঁজিবাজারে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা নিরসন এবং স্বাভাবিক লেনদেনের গতি ফিরিয়ে আনতে ইসলামী ব্যাংক ও বেক্সিমকো লিমিটেডের শেয়ার থেকে অবিলম্বে ফ্লোর প্রাইস বা দরপতনের সর্বনিম্ন সীমা প্রত্যাহারের জোর দাবি জানিয়েছে ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ)।
আজ সোমবার (০৪ মে) পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)-এর চেয়ারম্যান বরাবর পাঠানো এক চিঠিতে এই আহ্বান জানায় সংগঠনটি। সর্বশেষ ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের ২০ মাস পর এমন দাবি তুলেছে ডিএসই ব্রোকারদের সংগঠনটি।
পুঁজিবাজারে ন্যায্যতা, সমতা ও বিনিয়োগকারীদের অধিকার সুরক্ষার দাবি জানালেও বিএসইসির বর্তমান চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ বেক্সিমকো লিমিটেড ও ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারে ফ্লোর প্রাইস বহাল রাখেন। যার মাধ্যমে দেশে আর্থিক নানা কেলেঙ্কারির জন্ম দেওয়া এ দুই কোম্পানির শেয়ারের মূল্যকে কৃত্রিম সুরক্ষা দিয়ে রেখেছে বিএসইসি। অথচ এটি একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিনিয়োগকারীর ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ডিবিএ প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এই চিঠিতে জানানো হয় যে, কৃত্রিম এই মূল্যসীমার কারণে বিশেষ করে বেক্সিমকো লিমিটেড দীর্ঘ সময় ধরে কার্যত লেনদেনবিহীন অবস্থায় পড়ে আছে, যা সাধারণ বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য চরম সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুঁজিবাজারের এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতির কারণে মার্জিন ঋণ গ্রহণকারী বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নেতিবাচক ইক্যুইটির ঝুঁকি তীব্র হচ্ছে, যা সামগ্রিক বাজার স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বেক্সিমকো লিমিটেডের শেয়ারে বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগ আটকে থাকায় বেশ কয়েকটি ব্রোকারেজ হাউস এখন অচল হওয়ার উপক্রম হয়েছে। লেনদেন না হওয়ায় আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মী ছাঁটাই করতে বাধ্য হচ্ছে, যার ফলে অনেক পেশাজীবী তাঁদের চাকরি হারিয়েছেন। এ ছাড়া অনেক ব্যাংক এই শেয়ারগুলোর বিপরীতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করে এখন বিপাকে পড়েছে, যাদের সম্ভাব্য লোকসান সামাল দিতে ৫০ থেকে ৭০ কোটি টাকা পর্যন্ত প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এই ফ্লোর প্রাইস বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করেছে জানিয়েছে ডিবিএ। কৃত্রিমভাবে দর নিয়ন্ত্রণ করার ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা এখন তলানিতে ঠেকেছে। এই মূল্যসীমা আরোপের কারণেই লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ গ্রুপের সাবসিডিয়ারি এফটিএসই রাসেল বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের রেটিং অবনমন করেছে, যা বৈশ্বিক বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের বাজারকে এখন একটি ‘অস্বাভাবিক’ ও ‘নিয়ন্ত্রিত’ বাজার হিসেবে বিবেচনা করছেন, যার ফলে নতুন করে মূলধন আসার পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে।
দেশে প্রথম ২০২০ সালের মার্চে কোভিড মহামারীর সময় পতন ঠেকাতে এই বিতর্কিত ফ্লোর প্রাইস ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০২১ সালের জুনে তা প্রত্যাহার করা হলেও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে ২০২২ সালের জুলাই মাসে দ্বিতীয় দফায় আবারও ফ্লোর প্রাইস আরোপ করে বিএসইসি। ২০২৪ সালে ধাপে ধাপে অধিকাংশ কোম্পানির ওপর থেকে এই সীমা তুলে নেওয়া হলেও রহস্যজনকভাবে ইসলামী ব্যাংক ও বেক্সিমকো লিমিটেডের ওপর তা বহাল রাখা হয়। ডিবিএ মনে করে, এই দুই বড় কোম্পানির শেয়ার লেনদেন বন্ধ থাকা মানে হলো বাজারের একটি বড় অংশকে কৃত্রিমভাবে অকেজো করে রাখা।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং বাজারের গতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার অন্য কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছে ডিবিএ। সংগঠনটির মতে, বাজারের স্বাভাবিক চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতে শেয়ারের দাম নির্ধারিত হতে না দিলে পুঁজিবাজার কখনোই তার নিজস্ব শক্তি ফিরে পাবে না। তাই বিনিয়োগকারীদের পুঁজি রক্ষা এবং ব্রোকারেজ হাউসসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে বিএসইসি দ্রুত এই ‘ফ্লোর প্রাইস যুগের’ অবসান ঘটাবে—এমনটাই প্রত্যাশা করছে দেশের পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা।কারখানা সচলের জন্য ঋণের গ্যারান্টি চায় ব্যাংকগুলো
কর্মসংস্থান বাড়াতে বিশেষ উদ্যোগ।
বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানাগুলো পুনরায় সচল করতে অর্থায়নের ক্ষেত্রে সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্যারান্টি দাবি করেছেন বাণিজ্যিক ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তারা। আজ রোববার বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর কবির আহাম্মদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় ব্যাংকগুলোর প্রধান ঝুঁকি কর্মকর্তা ও প্রধান ব্যবসা কর্মকর্তারা এই দাবি উত্থাপন করেন।
মূলত কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে বন্ধ কারখানা চালুর বিষয়ে সম্প্রতি সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়। এই ঘোষণা বাস্তবায়নে একটি কার্যকর নীতিমালা এবং পুনঃ অর্থায়ন তহবিল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই প্রক্রিয়ায় অংশীজনদের মতামত জানতেই আজকের সভার আয়োজন করা হয়, যেখানে ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাঁদের বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ ও শর্ত তুলে ধরেন।
ব্যাংকারদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ঋণের বিপরীতে পূর্ণ নিশ্চয়তা বা গ্যারান্টি সুবিধা। তারা জানান, বন্ধ কারখানা সচল করতে দেওয়া ঋণ যদি পুনরায় খেলাপি হয়ে পড়ে, তবে ব্যাংক যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেজন্য সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গ্যারান্টি প্রয়োজন। এছাড়া নতুন ঋণের ক্ষেত্রে বিদ্যমান নিরাপত্তার পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে বাড়তি জামানত নিশ্চিত করারও পরামর্শ দিয়েছেন ব্যাংকাররা।
কারখানাগুলো সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে কি না এবং ঋণের অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, তা তদারক করতে ব্যাংকের পক্ষ থেকে বিশেষ পরামর্শক নিয়োগের সুযোগ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, যারা কোম্পানি বন্ধ করে অর্থ পাচার করে বিদেশে পালিয়ে গেছেন, তারা এই সুবিধার আওতায় আসবে না। শুধুমাত্র নিয়ন্ত্রণবহির্ভূত কারণে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তারাই এই সুযোগ পাবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, কারখানা বন্ধের সময়কাল ও যন্ত্রপাতির অবস্থার ওপর ভিত্তি করে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। সম্প্রতি বন্ধ হওয়া কারখানার জন্য স্বল্পমেয়াদি এবং যাদের যন্ত্রপাতি অকেজো হয়ে পড়েছে তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ব্যবস্থা থাকবে। এ লক্ষ্যে একটি বিশেষ পুনঃ অর্থায়ন তহবিল গঠন করা হবে যা সরকারি অর্থায়নে হতে পারে। নীতিমালা ও তহবিলের চূড়ান্ত রূপরেখা ঠিক করতে আগামীকাল সোমবারের মধ্যে ব্যাংকগুলোর কাছে লিখিত প্রস্তাব চেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
সভায় ব্যাংকাররা উল্লেখ করেন যে, নীতি-সহায়তার আওতায় ৩০০ গ্রুপের এক হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠানের ঋণ নিয়মিত করা হয়েছে, যা চালু হলে অর্থনীতিতে গতি ফিরতে পারে। তবে তারা সতর্ক করে বলেন, অনেক বন্ধ কারখানার বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে মামলা চলমান থাকায় নতুন অর্থায়নে আইনি জটিলতা দেখা দিতে পারে। এছাড়া করোনাকালীন প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণের বড় একটি অংশ বর্তমানে খেলাপিতে পরিণত হওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে ব্যাংকগুলো গ্যারান্টি সুবিধা চাচ্ছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, ঋণের প্রাথমিক ঝুঁকি ব্যাংকগুলোকেই বহন করতে হবে।













