লুন্ঠিত ব্যাংকের মালিকানা যেভাবে পাওয়া যাবে

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক

একীভূত হওয়া ও বর্তমানে কার্যত সরকারি নিয়ন্ত্রণে থাকা দেউলিয়া প্রায় ব্যাংকগুলোর মালিকানায় পুনরায় ফিরতে চাইলে সাবেক উদ্যোক্তা পরিচালকদের পাড়ি দিতে হবে এক কঠিন ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া। কেবল অর্থ জমা দিলেই মালিকানা ফেরত পাওয়া যাবে না, বরং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর ‘ফিট অ্যান্ড প্রপার’ টেস্টে উত্তীর্ণ হওয়া এবং অতীতে কোনো অনিয়মের সাথে জড়িত না থাকার প্রমাণ দেওয়া এখন বাধ্যতামূলক।

আজ রোববার (৩ মে) এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. আরিফ হোসেন খান মালিকানা ফিরে পাওয়ার আইনি ও নীতিগত প্রক্রিয়াগুলো বিস্তারিত তুলে ধরেন।

মুখপাত্রের বক্তব্য অনুযায়ী, দেউলিয়া হওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে সরকার যে পাঁচটি ইসলামী ব্যাংককে (ইউনিয়ন, ফার্স্ট সিকিউরিটি, গ্লোবাল, সোশ্যাল ইসলামী ও এক্সিম) একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করেছে, সেগুলোর সাবেক মালিকদের জন্য মালিকানায় ফেরার একটি সুযোগ আইনত রয়েছে। এজন্য তাদের প্রথম ধাপ হিসেবে সাড়ে ৭ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট বা সমপরিমাণ শেয়ারের অর্থ জমা দিয়ে মালিকানা ফেরত পাওয়ার দাবি করার সুযোগ দেওয়া হবে। তবে এটি কেবল মালিকানায় ফেরার একটি সূচনা মাত্র, চূড়ান্ত কোনো নিশ্চয়তা নয়।

আরিফ হোসেন খান স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, সাড়ে ৭ শতাংশ অর্থ জমা দেওয়া মানেই সরাসরি পরিচালক হওয়া বা ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়া নয়। পরিচালক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের যে বিশেষ স্ক্রিনিং বা যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া রয়েছে, সেখানে তাদের প্রতিটি শর্ত পূরণ করতে হবে। বিশেষ করে যারা অতীতে ব্যাংকের অর্থ লুটপাট, বেনামি ঋণ প্রদান বা দুর্নীতির মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিলেন, তাদের জন্য এই মালিকানা ফিরে পাওয়ার পথ কার্যত রুদ্ধ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, এই পাঁচটি ব্যাংকের সম্মিলিত খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৭৭ শতাংশ। কোনো কোনো ব্যাংকের ক্ষেত্রে এই হার ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত। ব্যাংকগুলোর এই ভয়াবহ পরিণতির জন্য দায়ী ব্যক্তিদের কোনোভাবেই পুনরায় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সুযোগ দেওয়া হবে না। যারা মালিকানায় ফিরতে চাইবেন, তাদের অবশ্যই স্বচ্ছ ভাবমূর্তি এবং আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ দিতে হবে।

বর্তমানে ব্যাংকটির মালিকানা সাময়িকভাবে সরকারের হাতে থাকলেও এটি চিরস্থায়ী কোনো ব্যবস্থা নয়। সরকার ২০ হাজার কোটি টাকা মূলধন জোগান দিয়ে ব্যাংকটিকে অক্সিজেন দিচ্ছে এবং একটি ‘ব্রিথিং স্পেস’ তৈরি করেছে। মুখপাত্রের ভাষায়, যখনই উপযুক্ত ও সক্ষম বেসরকারি বিনিয়োগকারী পাওয়া যাবে এবং ব্যাংকটির আর্থিক স্বাস্থ্য ভালো হবে, তখনই এটি পুনরায় বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া হবে। তবে সাবেক মালিকরা যদি যোগ্যতার প্রমাণ দিতে না পারেন, তবে সম্পূর্ণ নতুন ও স্বচ্ছ বিনিয়োগকারীদের হাতেই ব্যাংকের দায়িত্ব তুলে দেওয়া হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, দেউলিয়া প্রায় এই ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি মেটাতে সরকার এবং অন্যান্য তহবিল থেকে মোট ৩৫ হাজার কোটি টাকার একটি বড় তহবিল গঠন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ব্যাংকটির আমানতকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হচ্ছে। মালিকানা ফেরতের প্রক্রিয়ায় কঠোর হওয়ার মূল কারণ হলো, যাতে পুনরায় একই ধরনের লুটপাটের পুনরাবৃত্তি না ঘটে। উপযুক্ত বিনিয়োগকারী না পাওয়া পর্যন্ত সরকারি মালিকানাধীন এই একক কাঠামোতেই ব্যাংকটি পরিচালিত হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মালিকানা ফিরে পাওয়ার পুরো বিষয়টি এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর নজরদারি এবং আইনি কাঠামোর ওপর নির্ভর করছে। যারা মালিকানা দাবি করবেন, তাদের অতীতে বিতরণকৃত সন্দেহজনক ঋণ আদায় এবং ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে কতটুকু ভূমিকা থাকবে, সেটিও বড় বিবেচ্য বিষয় হবে। অর্থাৎ, টাকা দিয়ে নয়, বরং সততা ও সক্ষমতা দিয়ে আবারও ব্যাংকের মালিকানা ফিরে পাওয়ার পরীক্ষায় বসতে হবে সাবেক উদ্যোক্তাদের।

অর্থনীতি বিশ্লেষক মো. মাজেদুল হকের পর্যবেক্ষণ হলো, শুধু অর্থ বরাদ্দ দিয়ে ব্যাংক খাতের ভগ্নদশা কাটানো সম্ভব নয়। তিনি বলেন, ‘সরকার অর্থ দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত ফল মিলছে না। আস্থা ফেরানোর একমাত্র পথ হলো যোগ্য ও স্বচ্ছ ইমেজের উদ্যোক্তাদের কাছে ব্যাংক হস্তান্তর করা। সরকারকে দ্রুত এ বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top