এলডিসি উত্তরণ পেছাতে জাতিসংঘে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ

Web Photo Card May 03 2026 BGMEA
ছবি: বিজিএমইএ

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের টেকসই ও মসৃণ অর্থনৈতিক রূপান্তর নিশ্চিত করতে উত্তরণের সময়সীমা আরও তিন বছর বাড়ানোর জন্য জাতিসংঘের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ। বর্তমানে নির্ধারিত ২০২৬ সালের পরিবর্তে এই সময়সীমা ২০২৯ সাল পর্যন্ত করার প্রস্তাবকে জোরালো সমর্থন জানিয়েছে দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ।

এই প্রস্তাবের প্রেক্ষাপটে গত ২৯ এপ্রিল জাতিসংঘের কমিটি ফর Development পলিসি (ইউএন-সিডিপি) বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভার্চুয়াল পরামর্শ সভায় মিলিত হয়। সভায় সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা অংশ নিয়ে বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরেন।

বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এবং পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মোঃ জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি। এছাড়াও সভায় বিডা’র চেয়ারম্যান এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিবসহ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি হিসেবে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খানের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী দল এই সভায় অংশগ্রহণ করে। এছাড়া পাদুকা ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি, ওষুধ শিল্প এবং ঢাকা চেম্বারের (ডিসিসিআই) সভাপতিসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী নেতারা সভায় তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন।

সভায় সরকারের পক্ষ থেকে বর্তমান বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, অর্থনৈতিক ঝুঁকি এবং বেসরকারি বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতাগুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়। প্রতিনিধিদল জানায়, একটি সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে উত্তরণকালীন প্রস্তুতি সম্পন্ন করা বর্তমান সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তাই জাতিসংঘের ‘ক্রাইসিস রেসপন্স’ বা সংকটকালীন বিশেষ বিধানের আওতায় এই সময়সীমা বাড়ানো অপরিহার্য।

বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান তার উপস্থাপনায় পোশাক খাতের সুনির্দিষ্ট উদ্বেগের বিষয়গুলো অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরেন। তিনি বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিএসপি প্লাস সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত বাজার হারানোর ঝুঁকি এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের পর্যাপ্ত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) না থাকার বিষয়টি উল্লেখ করেন।

পোশাক খাতের পক্ষ থেকে জানানো হয়, রুলস অফ অরিজিন সংক্রান্ত জটিলতা এবং ব্যবসার খরচ কমিয়ে আনার জন্য শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। এর জন্য আরও কিছু সময়ের প্রয়োজন রয়েছে যাতে একটি সুনির্দিষ্ট ‘রোডম্যাপ’ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পন্ন করে সামগ্রিক অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করা যায়।

সভায় ব্যবসায়িক পরিবেশ সহজ করা বা ‘ইজ অফ ডুইং বিজনেস’ নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদী নীতিমালার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়। এলডিসি উত্তরণের ফলে রপ্তানি আয় ও কর্মসংস্থানে যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, তা মোকাবিলায় সব অংশীজন একটি ঐক্যবদ্ধ অবস্থান তুলে ধরেন।

জাতিসংঘের এই পরামর্শ সভাটি অত্যন্ত সফলভাবে শেষ হয়েছে এবং বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল ইউএন-সিডিপি-র উত্থাপিত বিভিন্ন প্রশ্নের তথ্যভিত্তিক উত্তর দিয়েছেন। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এই সুসমন্বিত প্রচেষ্টার ফলে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার আবেদনের পক্ষে একটি ইতিবাচক ফলাফল আসবে।

প্রসঙ্গত বাংলাদেশ বর্তমানে ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার পথে রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, উত্তরণের পর বাংলাদেশ বর্তমানে ভোগ করা শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক অগ্রাধিকার হারাবে। তবে করোনা পরবর্তী বৈশ্বিক মন্দা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই বড় পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে পোশাক খাতে ইইউ বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা হারানো এবং অন্যান্য দেশের সাথে এফটিএ স্বাক্ষরে পিছিয়ে থাকা বাংলাদেশের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ। এই বাস্তবতায় সরকার ও বেসরকারি খাত যৌথভাবে ২০২৯ সাল পর্যন্ত অতিরিক্ত তিন বছর সময় চেয়ে জাতিসংঘের কাছে আবেদন করেছে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top