আঞ্চলিক প্রতিযোগী দেশগুলো যখন প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের জোয়ারে ভাসছে, বাংলাদেশ তখন হাঁটছে ঠিক উল্টো পথে। পরিসংখ্যান বলছে, বিনিয়োগ আকর্ষণে ভিয়েতনাম কিংবা ইন্দোনেশিয়া তো দূরের কথা, কম্বোডিয়ার মতো ছোট অর্থনীতির কাছেও পাত্তাই পাচ্ছে না বাংলাদেশ।
জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা আঙ্কটাড (ইউএনসিটিএডি)-এর সর্বশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র—ভিয়েতনামের সঞ্চিত বিনিয়োগের ভাণ্ডার বাংলাদেশের চেয়ে ১৩ গুণ বড়, আর ইন্দোনেশিয়া এগিয়ে ১৭ গুণ বেশি। বিনিয়োগের এই কঙ্কাল দশা নিয়ে সোমবার (২৭ এপ্রিল) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিডা ও ইউএনডিপি আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রকাশিত হয়েছে ‘বিনিয়োগ নীতি পর্যালোচনা বাস্তবায়ন প্রতিবেদন ২০২৬’।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের সঞ্চিত বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই স্টক) ছিল মাত্র ১ হাজার ৮২৯ কোটি ডলার। যেখানে ভিয়েতনামের ২৪ হাজার ৯১৪ কোটি এবং ইন্দোনেশিয়ার ৩০ হাজার ৫৬৬ কোটি ডলারের বিশাল বিনিয়োগ ভাণ্ডার রয়েছে। এমনকি কম্বোডিয়ার মতো ছোট অর্থনীতিও বাংলাদেশের তুলনায় ৩ গুণ বেশি বিনিয়োগ ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় বিনিয়োগের হার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভিয়েতনামে যেখানে এই হার ৫৪ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশে তা মাত্র ৪ শতাংশে আটকে আছে। ২০১৯ সালে বাংলাদেশে ১৮৬ কোটি ডলারের যে বিনিয়োগ প্রবাহ ছিল, ২০২৪ সালে তা এক-তৃতীয়াংশ কমে ১২৬ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। অর্থাৎ কোভিড-১৯ মহামারির শুরুর সময়ের চেয়েও বর্তমানে বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ কম।
বিনিয়োগের এই ধসের পেছনে অতিমারি পরবর্তী ধাক্কা ও বৈশ্বিক অস্থিরতার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ নীতিগত দুর্বলতাকেই মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ সাল থেকে ডলারের বিপরীতে টাকার প্রায় ৩৬ শতাংশ অবমূল্যায়ন এবং তীব্র ডলার সংকটের কারণে কাঁচামাল ও জ্বালানি আমদানির ঋণপত্র (এলসি) খুলতে যে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়েছে, তা শিল্প খাতের সরবরাহ ব্যবস্থা তছনছ করে দিয়েছে। ফলে বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা করার সাহস হারাচ্ছেন।
এছাড়া উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ডলারের বড় অবমূল্যায়ন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মুনাফা ফিরিয়ে নেওয়া কঠিন করে তুলেছে। একই সময়ে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশ থেকে ৪ শতাংশে নামার ফলে বিনিয়োগকারীদের আস্থায় বড় ধস নামে।
বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী অনুষ্ঠানে স্বীকার করেন যে, ২০১৩ সালের পর থেকে বিনিয়োগের হারে তেমন কোনো গুণগত পরিবর্তন আসেনি। তিনি বলেন, “বিনিয়োগ বাড়াতে অনেক সুন্দর সুন্দর প্রতিবেদন বের হয়, আমরা তাতে একমতও হই; কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয় না।”
তার মতে, গত এক দশকে জিডিপির তুলনায় বিনিয়োগের হার বাড়েনি বরং কিছুটা কমেছে। বিডার এই তরুণ চেয়ারম্যান সতর্ক করে বলেন, বাংলাদেশের এখন সংস্কারের দ্বিতীয় ধাপে প্রবেশের সময় এসেছে। এর অর্থ হলো—কেবল আইন বা নীতি প্রণয়ন নয়, বরং সেই নীতিগুলো কত দ্রুত কার্যকর হচ্ছে তার ওপর নজরদারি করা। আগামী দুই-তিন বছরের মধ্যে যদি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দুর্নীতি কমিয়ে ওয়ান স্টপ সার্ভিসকে কার্যকর করা না যায়, তবে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় ব্যবধান আরও বাড়বে।
আঙ্কটাড (ইউএনসিটিএডি) রিপোর্টের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল তৈরি পোশাকশিল্পের অস্থিরতা। ২০২৩-২৪ অর্থবছর জুড়ে শ্রমিক অসন্তোষ এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে কারখানা বন্ধ হওয়া বিনিয়োগের পরিবেশে নেতিবাচক সংকেত পাঠিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সাধারণত স্থিতিশীল সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ খোঁজেন। শ্রম খাতে অস্থিরতা এবং আইন-শৃঙ্খলার অবনতি আস্থার জায়গায় বড় ফাটল ধরিয়েছে। এর ফলে নতুন বিনিয়োগ আসার বদলে অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিনিয়োগকারীরাও তাদের কার্যক্রম সীমিত করার কথা ভাবছেন।
উত্তরণের পথ: সংস্কারের তিন স্তম্ভ ও সমন্বিত উদ্যোগ
বিনিয়োগ পরিস্থিতি পুনরুদ্ধারে তিনটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের কথা জানিয়েছেন ইউএনডিপি বাংলাদেশের উপ-আবাসিক প্রতিনিধি সোনালী দায়ারত্নে। তিনি বলেন, প্রথমত সংস্কারের ইচ্ছা থেকে সরাসরি বাস্তবায়নের দিকে যেতে হবে। বিনিয়োগকারীরা কেবল প্রতিশ্রুতি নয়, বরং স্বচ্ছতা এবং পূর্বাভাস দেওয়ার সক্ষমতা চান। দ্বিতীয়ত, আইন বা প্রণোদনা দেওয়ার চেয়ে বড় কাজ হলো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো। তৃতীয়ত, বিনিয়োগ নীতিকে অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে হবে, যাতে তা দীর্ঘমেয়াদী কর্মসংস্থান ও উদ্ভাবনে ভূমিকা রাখতে পারে।
আঙ্কটাডের প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশকে এখন একটি সমন্বিত জাতীয় বিনিয়োগ নীতি গ্রহণ করতে হবে। বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন সংস্থার সংস্কার না করে কেন্দ্রীয়ভাবে একটি একক বিনিয়োগ আইনের মাধ্যমে সব কার্যক্রম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল করা জরুরি।
প্রতিবেদন উপস্থাপনকালে আঙ্কটাডের আইন কর্মকর্তা কিয়োশি আদাচি জানান, ২০২৫ সাল থেকে বাংলাদেশের বিনিয়োগ প্রবাহে কিছুটা পুনরুদ্ধারের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণ ও পুনর্বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রবাহ বাড়তে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, সামষ্টিক অর্থনীতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরলে ২০২৬ সাল নাগাদ বিনিয়োগ পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক ধারায় ফিরতে পারে।
অনুষ্ঠানে বক্তারা একমত হন যে, ভিশন ২০৪১ এবং এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনকে সফল করতে হলে বিনিয়োগ পরিবেশের এই স্থবিরতা ভাঙতেই হবে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হয়রানি বন্ধ, লজিস্টিক সাপোর্ট বৃদ্ধি এবং কর কাঠামোর আমূল সংস্কার ছাড়া প্রতিযোগী দেশগুলোর সাথে পাল্লা দেওয়া সম্ভব নয়।
বিডার নির্বাহী সদস্য মো. হুমায়ুন কবীরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সেশনে সরকারি-বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন, যেখানে একটি শক্তিশালী বিনিয়োগ রোডম্যাপ তৈরির আহ্বান জানানো হয়।













