বাংলাদেশে বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়নে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) একচ্ছত্র ক্ষমতা ও নীতির ঘন ঘন পরিবর্তন। বিনিয়োগ সহজীকরণের জন্য একাধিক সংস্থা কাজ করলেও রাজস্ব বোর্ডের হঠাৎ নেওয়া সিদ্ধান্তে বিনিয়োগকারীরা দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ছেন। রোববার (২৬ এপ্রিল) রাজধানীর রেনেসাঁ ঢাকা গুলশান হোটেলে ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফআইসিসিআই) আয়োজিত ‘উন্নত বিনিয়োগ পরিবেশের জন্য সহায়ক রাজস্বনীতি’ শীর্ষক সভায় এমন উদ্বেগের চিত্র ফুটে উঠেছে।
অনুষ্ঠানে সবচেয়ে কড়া সমালোচনা আসে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) কান্ট্রি ইকোনমিস্ট চন্দন সাপকোটার পক্ষ থেকে। তিনি সরাসরি প্রশ্ন তোলেন এনবিআরের একপাক্ষিক ক্ষমতা নিয়ে। সাপকোটা বলেন, “বাংলাদেশে ছয়-সাতটি বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থা বিনিয়োগ বাড়ানোর কর্মসূচি নিয়ে কাজ করে। কিন্তু বছরের মাঝামাঝি সময়ে দেখা যায়, এনবিআর হঠাৎ কোনো প্রজ্ঞাপন জারি করে আগের সুবিধা বাতিল করে দেয়। দক্ষিণ এশিয়ার পাঁচটি দেশে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, কোনো দেশে এমন ব্যবস্থা নেই যেখানে একটি সংস্থা (এনবিআর) সবকিছুর ঊর্ধ্বে অবস্থান করে।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, এনবিআরের এমন পদক্ষেপের কারণে বাংলাদেশে ব্যবসার নীতির ক্ষেত্রে কী ঘটবে, তার কোনো পূর্বাভাস করা সম্ভব হয় না। এই নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং বছরের মাঝামাঝি সময়ে ঘন ঘন নিয়ম পরিবর্তন বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি বড় বাধা। তার মতে, কর আদায়ের চেয়ে যারা আইন মেনে চলছে, তাদের ওপরই করের বোঝা বাড়ানো হচ্ছে।
এফআইসিসিআই সভাপতি ও বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রূপালী চৌধুরী বলেন, দেশে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের নিচে থাকলেও রাজস্ব আদায়ে ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির অসম্ভব লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে যারা নিয়মিত কর দিচ্ছেন, তাদের ওপরই বাড়তি চাপ বাড়ছে। তিনি অর্থনৈতিক অঞ্চলের ভেতরে ইউটিলিটি সার্ভিসের চড়া মূল্যের বৈষম্যমূলক বিধান নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
সভায় প্যানেল আলোচকরা বাংলাদেশের কর ব্যবস্থাকে সমন্বয়হীন এক গুচ্ছ ‘দ্বীপ’-এর সঙ্গে তুলনা করেন। বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্টের (বিল্ড) চেয়ারপারসন আবুল কাসেম খান বলেন, “এনবিআর ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নীতির মধ্যে কোনো মিল নেই। আমরা বিদেশি বিনিয়োগ আনতে শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ। ভিয়েতনাম যেখানে ১৮ বিলিয়ন ডলার এফডিআই পায়, সেখানে আমরা মাত্র ২ বিলিয়ন ডলারে আটকে আছি।” তিনি ১৯৪০-এর দশকের মান্ধাতা আমলের ট্রেড লাইসেন্স প্রথা বাতিলেরও দাবি জানান।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থতাকে ‘রাজনৈতিক ও কাঠামোগত ব্যর্থতা’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে কর অব্যাহতির কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই, যা সরকারি কোষাগারের বিশাল ক্ষতি করছে। বাজেট প্রণয়নের সময় সম্পদের চেয়ে ব্যয়কে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, যা সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামোর জন্য ক্ষতিকর।
মূল প্রবন্ধে পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ দেখান যে, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে অন্তত ১০০টি খাতে ভ্যাট পরিবর্তন করা হয়েছিল, যা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয় বরং নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তিনি ঢালাও কর অব্যাহতির পরিবর্তে লক্ষ্যভিত্তিক প্রণোদনা এবং স্থিতিশীল নীতির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান অঞ্চলের ডিভিশন ডিরেক্টর জ্যঁ পেম সতর্ক করে বলেন, শুধু কর প্রণোদনা দিয়ে দুর্বল বিনিয়োগ পরিবেশ ঢাকা সম্ভব নয়। দেশীয় ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগকেও সমান গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
এফআইসিসিআই-এর এই আলোচনা সভায় নীতিনির্ধারকদের প্রতি স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে—একটি স্থিতিশীল, স্বচ্ছ এবং পূর্বাভাসযোগ্য রাজস্ব নীতি ছাড়া বাংলাদেশের পক্ষে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং প্রত্যাশিত বিদেশি বিনিয়োগ অর্জন করা অসম্ভব।













