আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট যেন কোনোভাবেই ‘শাস্তিমূলক’ না হয়ে বরং ‘সহায়ক ও প্রবৃদ্ধিমুখী’ হয়, সরকারের প্রতি এমন জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি, ঢাকা (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান টি রহমান।
রবিবার (১৯ এপ্রিল) রাজধানীর লেকশোর হোটেলে এমসিসিআই ও ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত প্রাক-বাজেট সেমিনারে তিনি বলেন, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার এই চ্যালেঞ্জিং সময়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে নতুন করদাতাদের ভীতি দূর করে করের আওতা বাড়াতে বছরে মাত্র ১০০ বা ১০০০ টাকার ‘প্রতীকী ন্যূনতম কর’ প্রবর্তনের এক ব্যতিক্রমী প্রস্তাব দেন তিনি।
এমসিসিআই সভাপতি তাঁর বক্তব্যে করজাল সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, দেশে বর্তমানে এক কোটির বেশি টিআইএনধারী থাকলেও অর্ধেকেরও কম রিটার্ন জমা দেন। এই ব্যবধান ঘুচিয়ে সাধারণ মানুষকে কর প্রদানে উৎসাহিত করতে এনআইডি ও টিআইএন ডাটাবেজ পূর্ণাঙ্গভাবে একীভূত করা জরুরি। নতুন করদাতারা যেন কর দেওয়াকে বোঝা মনে না করেন, সেজন্য মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে সহজে এবং স্বল্প পরিমাণ প্রতীকী কর পরিশোধের ব্যবস্থা করা গেলে রাজস্ব আদায়ের চিত্র আমূল বদলে যাবে বলে তিনি মনে করেন।
সেমিনারে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে টার্নওভার ট্যাক্স বা মোট প্রাপ্তির ওপর কর ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে ০.৩ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এমসিসিআইয়ের মতে, বিদ্যমান কর কাঠামো অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে এবং মূলধনের প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা বর্তমান উচ্চ সুদহার ও ডলার সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তাই এসএমই খাতের সুরক্ষায় পৃথক কর হার এবং ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট সুবিধা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
করপোরেট করের ক্ষেত্রে কামরান টি রহমান বলেন, সরকার কর হার কমালেও নগদ লেনদেনের কঠোর শর্তের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান প্রকৃত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আমাদের অর্থনীতির বাস্তবতা বিবেচনায় এই শর্তটি বাতিলের পাশাপাশি তালিকাভুক্ত ও অ-তালিকাভুক্ত উভয় ধরনের কোম্পানির জন্য কর হার আরও ২.৫ শতাংশ কমানো হলে নতুন বিনিয়োগে গতি আসবে। এছাড়া আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমসের জন্য আলাদা পোর্টালের বদলে একটি সমন্বিত ‘ইউনিফাইড করদাতা প্রোফাইল’ চালুর প্রস্তাব করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে ইআরএফ সভাপতি দৌলত আকতার মালা রাজস্ব আদায়ের উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় এক লাখ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আগামী বাজেটে যদি আরও বড় অংকের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়, তবে তা নিয়মিত করদাতাদের ওপর বাড়তি হয়রানির কারণ হতে পারে। যখনই রাজস্বের চাপ বাড়ে, তখন নতুনদের খোঁজার বদলে যারা নিয়মিত কর দেন তাদের ওপরই সব বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়, যা অনভিপ্রেত।
সেমিনারে বক্তারা আরও উল্লেখ করেন, গত ১৫ বছরেও ভ্যাট আদায়ে ইসিআর বা ফিসক্যাল ডিভাইসের ব্যবহার পূর্ণাঙ্গভাবে নিশ্চিত করা যায়নি, যা রাজস্ব ফাঁকির পথ তৈরি করছে। ব্যবসায়িক গোপনীয়তা রক্ষায় মুসক ৪.৩ ফরমে ‘মূল্যমান’-এর পরিবর্তে শুধু পণ্যের ‘পরিমাণ’ উল্লেখ করার সুযোগ দেওয়ার দাবিও জানানো হয়। কাস্টমস পর্যায়ে ডাটাবেজ মূল্যের পরিবর্তে প্রকৃত ‘লেনদেন মূল্য’ অনুযায়ী শুল্কায়ন নিশ্চিত করা এবং অটোমেশন প্রক্রিয়া জোরদার করা হলে ব্যবসায়িক হয়রানি ও ব্যয় উভয়ই কমবে বলে এমসিসিআই সভাপতি কামরান টি রহমান তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন।













