এবার এক এজেন্টেই হবে সব ব্যাংকের লেনদেন

DSJ Web Photo April 16 2026 BankingNews
ডিএসজে

দেশের আর্থিক খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে ‘হোয়াইট লেভেল এজেন্ট নেটওয়ার্ক’ (ডব্লিউএলএএন) চালুর প্রক্রিয়া শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই নতুন ব্যবস্থার আওতায় গ্রাহককে আর ভিন্ন ভিন্ন সেবার জন্য আলাদা এজেন্টের কাছে ছুটতে হবে না; বরং একটি একক পয়েন্ট বা এজেন্টের মাধ্যমেই ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস), পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার (পিএসপি) এবং ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের (এমএফআই) যাবতীয় লেনদেন সম্পন্ন করা যাবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্ট-১ সম্প্রতি এ সংক্রান্ত একটি খসড়া নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো গ্রামীণ ও প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের কাছে সব ধরনের ডিজিটাল আর্থিক সেবা এক ছাতার নিচে পৌঁছে দেওয়া।

বর্তমানে বিকাশ, রকেট বা নগদের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব আলাদা এজেন্ট নেটওয়ার্ক রয়েছে। আবার ব্যাংকগুলোরও নিজস্ব এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট থাকে। হোয়াইট লেভেল এজেন্ট হবে এমন একটি অভিন্ন ব্যবস্থা, যেখানে নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানের লেবেল বা পরিচয় মুখ্য থাকবে না। একজন এজেন্ট একই সঙ্গে সব প্রতিষ্ঠানের গ্রাহককে সেবা দিতে পারবেন। বাংলাদেশ ব্যাংক এই এজেন্টদের ‘হিউম্যান এটিএম’ বা মানবীয় এটিএম হিসেবে গড়ে তুলতে চায়, যা দুর্গম এলাকাতেও নগদের চাহিদা মেটাবে।

খসড়া নীতিমালা অনুযায়ী, এসব এজেন্ট নগদ টাকা জমা ও উত্তোলন, এক ওয়ালেট থেকে অন্য ওয়ালেটে অর্থ স্থানান্তর, বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ সব ধরনের ইউটিলিটি বিল পরিশোধ এবং সরকারি পেমেন্ট (পি টু জি) গ্রহণ করতে পারবে। আধুনিক লেনদেনের সুবিধার্থে এখানে ‘বাংলা কিউআর’, মাইক্রো এটিএম, ডেবিট কার্ড এবং এনএফসি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। নিরাপত্তার জন্য প্রতিটি লেনদেনে ওটিপি, পিন বা বায়োমেট্রিক পদ্ধতি বাধ্যতামূলক থাকবে।

টেলিকম কোম্পানি, বড় খুচরা ও বিতরণ চেইন, ব্যাংক এবং ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো এই নেটওয়ার্ক পরিচালনার জন্য আবেদন করতে পারবে। লাইসেন্স প্রাপ্তির প্রক্রিয়া হবে তিন ধাপের—আবেদন, মূল্যায়ন ও পাইলট কার্যক্রম এবং চূড়ান্ত অনুমোদন। আবেদনের ফি ধরা হয়েছে ৫০ হাজার টাকা এবং লাইসেন্স ফি ৫ লাখ টাকা।

আর্থিক খাতের এই নতুন মডেলটি পরীক্ষামূলকভাবে পরিচালনার জন্য ‘পে-স্টেশন’ এবং ‘জয়তুন ফাউন্ডেশন’ নামে দুটি প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে কাজ করার কথা ভাবছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পে-স্টেশন প্রাথমিকভাবে এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করবে এবং জয়তুন ফাউন্ডেশন কাজ করবে ব্যাংকগুলোর সমন্বয়ে।

জয়তুন বিজনেস সলিউশনের চেয়ারম্যান আরফান আলী বলেন, বর্তমানে গ্রাহকদের এক একজন এজেন্টের কাছে গিয়ে নির্দিষ্ট সেবা নিতে হয়। কিন্তু হোয়াইট লেভেল এজেন্ট চালু হলে একজন এজেন্টের ব্যবসা যেমন বাড়বে, তেমনি গ্রামীণ অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি দ্রুততর হবে। এটি মূলত বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ক্যাশলেস বাংলাদেশ’ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের বড় একটি ধাপ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকী বলেন, হোয়াইট লেভেল এজেন্ট নিয়োগের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থপ্রবাহের বিস্তার ঘটবে। এটি মূলত থার্ড পার্টি লেনদেন ব্যবস্থার মতো, যেখানে এক এজেন্টের কাছেই গ্রাহক সব সেবা পাবেন। আমরা ইতিমধ্যে দুটি প্রস্তাব যাচাই-বাছাই করছি এবং শিগগিরই একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা জারি করা হবে।

খসড়া নীতিমালায় গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। কোনো এজেন্ট গ্রাহকের তথ্য সংরক্ষণ করতে পারবে না এবং প্রতিটি লেনদেনের পর তাৎক্ষণিক রসিদ বা এসএমএস নিশ্চিত করতে হবে। কোনো ধরনের জালিয়াতি বা মানি লন্ডারিংয়ের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করা হবে বলে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

সাবেক ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদ মামুন রশীদ এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, কেনিয়াসহ বিশ্বের অনেক দেশে এই মডেল অত্যন্ত সফল। ক্যাশলেস সমাজ গঠনে এটি মুখ্য ভূমিকা রাখতে পারে। তবে আমাদের দেশে সাধারণ মানুষের আর্থিক জ্ঞান তুলনামূলক কম। তাই সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে গ্রাহক শিক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। সঠিক সচেতনতা তৈরি করতে পারলে আমরা দ্রুত এই ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারব।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ২০২৫ সাল নাগাদ দেশে যে ৪২ কোটির বেশি ব্যাংক ও মোবাইল ওয়ালেট অ্যাকাউন্ট রয়েছে, তার একটি বড় অংশ বর্তমানে নিষ্ক্রিয়। হোয়াইট লেভেল এজেন্টদের মাধ্যমে সেবার সহজলভ্যতা বাড়লে এই নিষ্ক্রিয় অ্যাকাউন্টগুলো সচল হবে এবং ডিজিটাল অর্থনীতির ভিত্তি আরও মজবুত হবে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top