আসন্ন ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে একগুচ্ছ পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। প্রতিদিন মিলছে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের আশ্বাস। তবে এর বিপরীতে মাঠপর্যায়ে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট, তেলের পাম্প মালিকদের ধর্মঘটের হুমকি এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
রাজধানীর গুলিস্তানে শনিবার (১৪ মার্চ) বিআরটিসি বাস কাউন্টার পরিদর্শন শেষে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানান, ঈদযাত্রায় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে ঈদের আগে সাত দিন ও পরে পাঁচ দিন ২৪ ঘণ্টা ফিলিং স্টেশন খোলা রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, “আমরা দেখলাম নির্দিষ্ট টাইমে বাসগুলো গন্তব্যের দিকে ছেড়ে যাচ্ছে; ভাড়ার নির্ধারিত হার নেওয়া হচ্ছে। সিডিউল মেনটেন করে বাসগুলো চলছে।” তিনি আরও জানান, মহাসড়কের ২৬০টি যানজটপ্রবণ স্পট চিহ্নিত করে পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনকে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য চলমান জ্বালানি রেশনিংয়ের বিষয়ে মন্ত্রী ইঙ্গিত দেন, ১৫ মার্চের পর এ ব্যবস্থা পুনর্বিবেচনা হতে পারে। তিনি বলেন, “আশা করছি আপনারা আজ রাতে সুসংবাদ পাবেন।”
এদিকে, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ঈদযাত্রার চাপ সামলাতে ১২২টি পুরনো কোচ মেরামত ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে আমদানি করা আধুনিক কোচ যুক্ত করার কাজ শুরু করেছে। চট্টগ্রাম-ঢাকা ও অন্যান্য প্রধান রুটে কোচের সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। তবে কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন যে, ৩ হাজার কোচ ও ৩০০ লোকোমোটিভের চাহিদার বিপরীতে সচল ইঞ্জিনের সংখ্যা মাত্র দুই শতাধিক, যা সময়সূচি বিপর্যয়ের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সদরঘাটের অতিরিক্ত চাপ কমাতে এ বছর বছিলা ও পূর্বাচলের কাঞ্চন ব্রিজ সংলগ্ন শিমুলিয়া টুরিস্ট ঘাট থেকে বিশেষ লঞ্চ সার্ভিস চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ। ১৭ মার্চ থেকে এসব ঘাট থেকে চাঁদপুর, বরিশাল, শরীয়তপুর ও ইলিশার উদ্দেশ্যে বিশেষ লঞ্চ ছেড়ে যাবে। এছাড়া ১৭ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত সদরঘাট ও বরিশাল নদী বন্দরে বৃদ্ধ, নারী ও প্রতিবন্ধীদের জন্য বিনামূল্যে কুলি ও হুইলচেয়ার সেবা প্রদানের ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে।
ঈদযাত্রায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত উদ্ধার তৎপরতা চালাতে সশস্ত্র বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেলিকপ্টার ইউনিট প্রস্তুত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল ও কোস্ট গার্ডকেও সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে।
মাঠপর্যায়ে হাহাকার, ধর্মঘটের ডাক
সরকার জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার দাবি করলেও রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তীব্র পেট্রল ও অকটেন সংকট দেখা দিয়েছে। রাজধানীর অধিকাংশ পাম্পে ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড ঝুলছে। এই পরিস্থিতির প্রতিবাদে ও চাহিদামতো সরবরাহ না পাওয়ায় খুলনা বিভাগের ১০ জেলাসহ মোট ১৫ জেলায় তেল উত্তোলন বন্ধ রেখেছেন পাম্প মালিকরা।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউটরস, এজেন্টস অ্যান্ড পেট্রলপাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আনিসুর রহমান শিমুল হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “জ্বালানি সরবরাহ ও নিরাপত্তা—দুটি সংকটেই আমরা আছি। প্রশাসন নিরাপত্তার বিষয়ে কোনো সহায়তা দিচ্ছে না।” রাজশাহীতেও আগামী সোমবার থেকে তেল সংগ্রহ বন্ধের আলটিমেটাম দেওয়া হয়েছে।
সংকটকে পুঁজি করে অবৈধ মজুদের বিরুদ্ধেও অভিযান চালাচ্ছে প্রশাসন। শনিবার পাবনার সুজানগরে একটি গোয়ালঘর থেকে ১৫০০ লিটার অবৈধ মজুদকৃত তেল জব্দ করেছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর।
আকাশপথে স্থবিরতা ও যুদ্ধের ছায়া
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে আকাশসীমা বন্ধ থাকায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফ্লাইট বাতিলের হিড়িক পড়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ৪৭৫টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে, যার মধ্যে আজ শনিবারই বাতিল হয়েছে ২৪টি। কুয়েত এয়ারওয়েজ, কাতার এয়ারওয়েজ ও এমিরেটসের মতো বড় সংস্থার ফ্লাইটগুলো এতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
অর্থ বিভাগ এক মূল্যায়নের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে জ্বালানি আমদানি ব্যয় ও ভর্তুকির চাপ ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
তবে আশার কথা শুনিয়েছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। শনিবার তিনি জানান, কুমিল্লার শ্রীকাইল-৫ কূপ থেকে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন ৮-১০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হওয়া শুরু হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, “কোনো দেশ যখন আমদানিনির্ভর হয়, তখন যেকোনো বৈশ্বিক সংকটই তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়। আমরা যদি স্বাবলম্বী হতাম, তাহলে এসব ঝুঁকি আরও সহজে মোকাবিলা করতে পারতাম।”













