মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার মধ্যে বাংলাদেশে জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে সরকার একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে। একই সঙ্গে আসন্ন ঈদুল ফিতরকে ঘিরে কোটি মানুষের ঘরমুখো যাত্রা নির্বিঘ্ন করতে পরিবহন ও অবকাঠামো খাতে প্রস্তুতিও জোরদার করা হয়েছে।
পরিস্থিতি সামলাতে জ্বালানি সাশ্রয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য নির্দেশনা দেওয়া শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকগুলোকে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি ব্যবহারে মিতব্যয়ী হতে বলেছে এবং ব্যাংকারদের ব্যক্তিগত গাড়ির বদলে গণপরিবহন ব্যবহার বা কার-পুলিংয়ের পরামর্শ দিয়েছে বুধবার (১১ মার্চ)। পাশাপাশি অফিসে এসির তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে না রাখা, অপ্রয়োজনীয় আলো ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি বন্ধ রাখার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন দেখা দেওয়ায় জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে জনমনে উদ্বেগ তৈরি হলেও সরকার বলছে, বাস্তবে কোনো ঘাটতি নেই। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত মঙ্গলবার বলেছেন, “উদ্বেগের কারণ নেই। বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত আছে।”
প্রতিমন্ত্রী বলেন, গত সপ্তাহে টানা পাঁচ দিন স্বাভাবিক চাহিদার তুলনায় দুই থেকে তিন গুণ বেশি জ্বালানি সরবরাহ করা হলেও মানুষের উদ্বেগ পুরোপুরি কমেনি। “এই অস্বাভাবিক চাহিদা কোনো যৌক্তিক কারণে ছিল না। এটি উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা থেকে, প্যানিক বাইয়িং থেকে সৃষ্টি হয়েছে,” যোগ করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, পাম্পে যে দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে, তার বেশিরভাগই মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির।
সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, বৈশ্বিক উত্তেজনার কারণে মধ্যপ্রাচ্যে বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ঘিরে সরবরাহ বিঘ্নের আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় অনেক দেশে জ্বালানির দাম বেড়েছে এবং সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সেই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশও সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরে জ্বালানিবাহী জাহাজ খালাস কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। বর্তমানে বন্দরে ছয়টি জাহাজ থেকে জ্বালানি খালাস করা হচ্ছে এবং আরও চারটি জাহাজ দেশের বন্দরের পথে রয়েছে বলে বুধবার জানিয়েছে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)।
চট্টগ্রাম বন্দর ভবনে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বন্দরের সদস্য (হারবার ও মেরিন) ক্যাপ্টেন আহমেদ আমিন আবদুল্লাহ বলেন, “এ পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি নিয়ে মোট ১৮টি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে এসেছে। এর মধ্যে আটটি জাহাজ খালাস শেষ করে চলে গেছে এবং বর্তমানে ছয়টি জাহাজ থেকে জ্বালানি খালাস কার্যক্রম চলমান রয়েছে।”
তিনি জানান, এসব জাহাজে এলএনজি, এলপিজি, বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি তেল এবং শিল্পকারখানার কাঁচামাল রয়েছে। আগামী ১২ ও ১৪ মার্চ এলএনজি ও ডিজেলবাহী আরও দুটি জাহাজ বন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের ঊর্ধ্বতন মহাব্যবস্থাপক মো. ইউসুফ হোসেন ভূঁইয়া জানান, সিঙ্গাপুর থেকে ২৭ হাজার ৫ মেট্রিক টন ডিজেল নিয়ে ‘লিয়ান হুয়ান হু’ নামের একটি ট্যাংকার ইতোমধ্যে বন্দরে পৌঁছেছে। এর আগে ‘শিউ চি’ নামের আরেকটি ট্যাংকার ২৭ হাজার ২০৪ মেট্রিক টন ডিজেল নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে আসে।
তিনি জানান, পাইপলাইনে আরও কয়েকটি জাহাজ রয়েছে। এর মধ্যে ‘এসপিটি থেমিস’ নামের একটি ট্যাংকারে ৩০ হাজার ৪৮৪ মেট্রিক টন ডিজেল রয়েছে, যা বৃহস্পতিবার বন্দরে পৌঁছানোর কথা। এ ছাড়া ‘র্যাফেলস সামুরাই’ এবং ‘চ্যাং হ্যাং হং টু’ নামের আরও দুটি ট্যাংকার আগামী দিনগুলোতে বন্দরে আসবে। এসব চালান মিলিয়ে দেশে প্রায় ১ লাখ ৪৪ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল যুক্ত হবে।
পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে ‘মনিটরিং ও কন্ট্রোল সেল’ গঠন করেছে। চট্টগ্রামের কেন্দ্রীয় সেলের পাশাপাশি ঢাকা, বগুড়া, খুলনা, সিলেট ও বরিশালে আঞ্চলিক সেল কাজ করবে। এসব সেল প্রতিদিন জ্বালানি মজুত, সরবরাহ ও বিক্রির তথ্য সংগ্রহ করে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে পাঠাবে।
সরকার বিকল্প উৎস থেকেও জ্বালানি সংগ্রহ বাড়াচ্ছে। ভারতের আসামের নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী পাইপলাইনের মাধ্যমে ডিজেল সরবরাহ শুরু হয়েছে এবং দুই দিনে প্রায় ৫ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল দিনাজপুরের পার্বতীপুর ডিপোতে পৌঁছেছে। পার্বতীপুর ডিপোর ব্যবস্থাপক আহসান হাবিব বুধবার বলেন, “নুমালিগড় থেকে পাইপলাইনে সরাসরি পার্বতীপুরে ডিজেল পৌঁছাতে প্রায় ৬০ ঘণ্টা সময় লেগেছে।”
এদিকে অতিরিক্ত জ্বালানি সহায়তার জন্য ভারতকে আনুষ্ঠানিক চিঠিও দিয়েছে বাংলাদেশ। ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা বলেন, “বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত সহায়তার জন্য আনুষ্ঠানিক চিঠি পেয়েছি। এটি দ্রুত বিবেচনার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে।”
জ্বালানি পরিস্থিতির পাশাপাশি সরকার এখন নজর দিচ্ছে ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করার প্রস্তুতিতে। প্রতি বছর ঈদকে কেন্দ্র করে কোটি মানুষ রাজধানী ও শিল্পাঞ্চল ছেড়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় নিজ নিজ বাড়িতে যান।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ মঙ্গলবার বাসস-কে বলেছেন, ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে একাধিক সমন্বয় সভা করা হয়েছে। “যাতে যাত্রীরা নির্ধারিত ভাড়ায় নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন এবং সড়কে যানজট কম থাকে, সে লক্ষ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
তিনি জানান, মহাসড়কে নির্মাণকাজের জন্য পড়ে থাকা মালামাল সরিয়ে নেওয়া এবং ভাঙাচোরা সড়ক অস্থায়ীভাবে সংস্কারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ঈদের আগে বাস টার্মিনাল ও রেলস্টেশনে সরেজমিনে তদারকি করা হবে।
বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষও ঈদযাত্রা সহজ করতে বিভিন্ন নির্দেশনা দিয়েছে। সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফ বুধবার বলেছেন, দেশের গুরুত্বপূর্ণ সেতুগুলোর উভয় প্রান্তে ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন বা ইটিসি বুথ চালু রাখতে হবে যাতে যানবাহন দ্রুত পার হতে পারে। সিসিটিভির মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ট্রাফিক পয়েন্ট সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
রেলপথেও প্রস্তুতি চলছে। নীলফামারীর সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় ঈদের আগে বিভিন্ন আন্তঃনগর ট্রেনে যুক্ত করার জন্য ১১২টি কোচ মেরামত করা হচ্ছে। শ্রমিকরা অতিরিক্ত সময় কাজ করে দ্রুত এসব কোচ প্রস্তুত করছেন।
ক্যারেজ শপের শ্রমিক আজিজুল ইসলাম বলেন, “প্রতি বছর ঈদের আগে আমরা বাড়তি সময় কাজ করি। আমাদের শ্রমে ঘরমুখো মানুষ পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করতে পারবে—এটাই আমাদের আনন্দ।”
বাস পরিবহন খাতেও প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ঢাকার মহাখালী, গাবতলী ও সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে যাত্রীদের অভিযোগ গ্রহণের জন্য ‘প্যাসেঞ্জার হেল্প ডেস্ক’ স্থাপন করা হবে বলে বুধবার জানিয়েছেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব মো. সাইফুল আলম।
তিনি বলেন, “ঈদযাত্রায় কোনো অবস্থাতেই যাত্রী হয়রানি করা যাবে না। ফিটনেসবিহীন কোনো বাস সড়কে চলতে দেওয়া হবে না।”
তবে কিছু সংগঠন সতর্ক করে বলছে, জ্বালানি সরবরাহে সীমা নির্ধারণ বা রেশনিং ব্যবস্থা থাকলে ঈদযাত্রায় ভোগান্তি বাড়তে পারে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী মঙ্গলবার বলেন, “ঢাকা ও আশপাশের এলাকা থেকে প্রায় দেড় কোটি মানুষ ঈদের সময় বাড়ি ফিরবে। পরিবহনে জ্বালানি সরবরাহ সীমিত থাকলে অনেক যানবাহন নির্ধারিত ট্রিপ চালাতে পারবে না।”
সরকার অবশ্য বলছে, পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে রাইড শেয়ারিং মোটরসাইকেলের জন্য দৈনিক জ্বালানি নেওয়ার সীমা বাড়িয়ে পাঁচ লিটার করা হয়েছে, যাতে নগর পরিবহন সচল থাকে।
সরকারি কর্মকর্তাদের আশা, নতুন জ্বালানি চালান আসা এবং সরবরাহ পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকলে বাজারের উদ্বেগ দ্রুত কমে যাবে।
প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, “যখন মানুষ দেখবে যে পেট্রোল পাম্পে জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে এবং দামও বাড়েনি, তখন এই উদ্বেগ স্বাভাবিকভাবেই কমে যাবে।”
তবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা এবং দেশের অন্যতম বড় মৌসুমি ভ্রমণ—ঈদযাত্রা—একই সময়ে সামনে চলে আসায় আগামী কয়েক সপ্তাহ বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ ও পরিবহন ব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।
রাশিয়া থেকে তেল কিনতে মার্কিন ‘ওয়েভার’ চায় বাংলাদেশ
এদিকে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে রাশিয়া থেকে তেল কেনার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বিশেষ অনুমতি বা অস্থায়ী ছাড় (ওয়েভার) চেয়েছে বাংলাদেশ। ভারতের মতো বাংলাদেশকেও একই ধরনের সুযোগ দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বুধবাররাজধানীর শেরেবাংলানগরে পরিকল্পনা মন্ত্রীর কার্যালয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিসটেনসেনের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান তিনি।
মন্ত্রী বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে রাশিয়ার তেল কেনার ক্ষেত্রে ভারতকে একটি অস্থায়ী ওয়েভার দিয়েছে; বাংলাদেশও একই ধরনের সুযোগ পাওয়ার আশা করছে। তিনি বলেন, “আমরা বলেছি—বাংলাদেশকেও যদি এমন সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে তা আমাদের অর্থনীতির জন্য বড় সহায়তা হবে। বিষয়টি তাঁরা ওয়াশিংটনে পাঠাবে বলে জানিয়েছে।” বৈঠকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের বর্তমান অনিশ্চয়তা নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক বিনিয়োগ, বাণিজ্য এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্বারোপ করা হয়।
এছাড়া জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকে তিন কার্গো এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) ক্রয়ের একটি প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে সরকার। ২০২৬ সালের এপ্রিলের শুরুতে সরবরাহের লক্ষ্য নিয়ে বুধবার অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
অনুমোদিত প্রস্তাব অনুযায়ী, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ বজায় রাখতে যুক্তরাজ্যের ‘টোটাল এনার্জিস গ্যাস অ্যান্ড পাওয়ার লিমিটেড’ থেকে এক কার্গো এবং দক্ষিণ কোরিয়ার ‘পস্কো ইন্টারন্যাশনাল কর্পোরেশন’ থেকে দুই কার্গো এলএনজি কেনা হবে। এই তিন কার্গো এলএনজি আমদানিতে সরকারের আনুমানিক ব্যয় হবে প্রায় ২ হাজার ৬৫৪ কোটি টাকা। ক্রমবর্ধমান গ্যাসের চাহিদা মেটানো এবং জাতীয় জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সরকার নিয়মিতভাবে এই প্রক্রিয়ায় এলএনজি সংগ্রহ করে যাচ্ছে বলে সভায় জানানো হয়।













