ঈদের ছুটিতে স্বস্তি দেবে না আর্থিক খাতের ঝুঁকি

ডিএসজে কোলাজ
ডিএসজে কোলাজ

আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে দীর্ঘ ছুটির আমেজ এবং একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে উদ্ভূত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা—এই দুই বাস্তবতাকে সামনে রেখে দেশের আর্থিক ও বাণিজ্যিক খাতে বিশেষ প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে।

সরকার ঘোষিত ১৭ মার্চ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত টানা সাত দিনের ছুটিতে সাধারণ গ্রাহকদের লেনদেন নির্বিঘ্ন রাখা, পোশাক শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ এবং দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম সচল রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড থেকে বিস্তারিত নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।

তবে এই উৎসবের প্রস্তুতির সমান্তরালে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান সংঘাত বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির ছায়া ফেলছে বলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্ট এবং সুপারভাইজারি ডেটা ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড অ্যানালিটিক্স ডিপার্টমেন্ট থেকে জারি করা পৃথক নির্দেশনায় জানানো হয়েছে, ঈদের ছুটিতে গ্রাহকদের ভোগান্তি কমাতে সব তফসিলি ব্যাংকের এটিএম বুথগুলোতে পর্যাপ্ত নগদ টাকার সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

এটিএম বুথে কোনো ধরনের কারিগরি ত্রুটি দেখা দিলে তা দ্রুততম সময়ে সমাধান করা, সার্বক্ষণিক পাহারাদারের মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পিওএস ও ই-পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন সেবা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিশেষ করে কার্ডভিত্তিক ‘কার্ড নট প্রেজেন্ট’ লেনদেনের ক্ষেত্রে টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন ব্যবস্থা এবং প্রতিটি লেনদেনের তথ্য এসএমএস অ্যালার্টের মাধ্যমে গ্রাহককে জানানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

এছাড়া বিকাশ, রকেট বা নগদের মতো মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এই সময়ে নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিত করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

ছুটির সময় শিল্পাঞ্চল ও বন্দরকেন্দ্রিক বাণিজ্যিক কার্যক্রম সচল রাখা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে দেখা দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরী, আশুলিয়া, টঙ্গী, গাজীপুর, সাভার, ভালুকা, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামে অবস্থিত তৈরি পোশাক শিল্প সংশ্লিষ্ট ব্যাংক শাখাগুলো আগামী ১৮ ও ১৯ মার্চ সীমিত পরিসরে খোলা থাকবে। এসব শাখায় সকাল ১০টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত অফিস কার্যক্রম চলবে এবং দুপুর ১টা পর্যন্ত লেনদেন করা যাবে।

একইভাবে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের স্বাভাবিক গতি বজায় রাখতে ১৭ মার্চ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত (ঈদের দিন ছাড়া) কাস্টমস হাউস ও স্টেশনগুলোতে সীমিত পরিসরে কার্যক্রম চালু রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। এই সিদ্ধান্তের সাথে মিল রেখে সমুদ্র, স্থল ও বিমান বন্দর এলাকার ব্যাংক শাখা ও বুথগুলোও স্থানীয় প্রশাসন ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে খোলা রাখার ব্যবস্থা করা হবে।

উৎসবের এই প্রস্তুতির মধ্যেই ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছে। বুধবার (১১ মার্চ) এক বিবৃতিতে সংগঠনটি জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে, যা বাংলাদেশের বহির্খাতের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

ডিসিসিআই-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০ ডলার বাড়লে বাংলাদেশের মাসিক আমদানি ব্যয় প্রায় ৭০ থেকে ৮০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। এটি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টিসহ বাণিজ্য ঘাটতি আরও বাড়িয়ে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।

বিশেষ করে বৈশ্বিক তেল ও গ্যাসের ২০ শতাংশ যে পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, সেই ‘হরমুজ প্রণালী’ সংঘাতের কারণে বিঘ্নিত হলে ফ্রেইট চার্জ এবং বিমা প্রিমিয়াম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।

দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ডিসিসিআই আরও উল্লেখ করেছে যে, স্থানীয় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে গত সাত মাসে রপ্তানি আয় আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। এমন পরিস্থিতিতে লজিস্টিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং সাপ্লাই চেইন বিঘ্নিত হলে তৈরি পোশাক খাতসহ অন্যান্য রপ্তানিমুখী শিল্প বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়বে।

তবে পরিস্থিতির কিছুটা ইতিবাচক দিক হলো, সম্প্রতি এলএনজি, এলপিজি ও ডিজেলবাহী ১০টির বেশি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে প্রবেশ করেছে, যা অন্তত ঈদের এই সময়ে অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক হবে। দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি মোকাবিলায় ডিসিসিআই সরকারকে কৌশলগত জ্বালানি মজুত জোরদার করা, আমদানির উৎস বহুমুখী করা এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাতের মধ্যে সমন্বয় আরও দৃঢ় করার পরামর্শ দিয়েছে।

১৭ মার্চ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত টানা সাত দিনের এই ছুটির মধ্যে ২১ মার্চ বাংলাদেশে ঈদুল ফিতর উদযাপিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। উৎসবের এই সময়ে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করতে ডিজিটাল লেনদেন ও এটিএম সেবা সচল রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে বৈশ্বিক যুদ্ধের প্রভাব থেকে দেশের অর্থনীতিকে রক্ষা করতে নীতিগত সতর্কতার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো পর্যন্ত সবাই এখন তাকিয়ে আছে বৈশ্বিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার দিকে, কারণ দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের অর্থনৈতিক সহনশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top