ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্য সংকটের ডামাডোলের মাঝেও বাংলাদেশের নতুন সরকারের আমলে ঢাকায় ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের ‘বাণিজ্য যুদ্ধ’ জমে ওঠার স্পষ্ট আভাস পাওয়া যাচ্ছে। আজ রোববার (৮ মার্চ) মার্কিন ও চীনা প্রতিনিধিদের উচ্চপর্যায়ের তৎপরতা এবং বড় অঙ্কের বিনিয়োগ চুক্তি স্বাক্ষরের মতো ঘটনা ঘটেছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত নতুন সরকার যখন বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, ঠিক তখনই রোববার সকালে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) কমপ্লেক্সে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেনের নেতৃত্বে এক উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, শ্রম ইস্যু এবং বিশেষ করে জ্বালানি খাতে মার্কিন বিনিয়োগ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খানের পক্ষ থেকে মার্কিন তুলা ব্যবহার করে তৈরি পোশাকে শুল্ক ছাড়ের মেকানিজম সম্পর্কে স্পষ্টীকরণ চাওয়া হলে রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টেনসেন একটি বড় ঘোষণা দেন। তিনি জানান, বিষয়টি বর্তমানে ইউনাইটেড স্টেটস ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভের (ইউএসটিআর) কার্যালয়ে বিবেচনাধীন এবং বাংলাদেশই বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে এই বিশেষ সুবিধা পেতে যাচ্ছে। এটি কেবল বাণিজ্য সুবিধা নয়, বরং তুলা আমদানির বাজারে বেইজিংয়ের প্রভাব কমিয়ে ঢাকাকে মার্কিন বলয়ে আরও দৃঢ়ভাবে বাঁধার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বৈঠকে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান শিল্প খাতের চাহিদা মেটাতে জ্বালানি খাতে মার্কিন বিনিয়োগের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। বিজিএমইএ সভাপতি স্বল্প মেয়াদে এলএনজি অবকাঠামো এবং দীর্ঘ মেয়াদে দেশীয় গ্যাস উত্তোলনে মার্কিন প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের আহ্বান জানান। জবাবে রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টেনসেন স্পষ্ট করেন যে, বাংলাদেশে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল জ্বালানি নীতি প্রণয়ন করা হলে মার্কিন বিনিয়োগকারীরা এ খাতে বিনিয়োগে অত্যন্ত আগ্রহী হবে। এ ছাড়া বৈঠকে ১৪৫টি নির্দিষ্ট পয়েন্ট নিয়ে প্রস্তাবিত নতুন শ্রম অধ্যাদেশ এবং উদ্যোক্তাদের জন্য ভিসা বন্ড শিথিল করার বিষয়গুলোও গুরুত্ব পায়।
ওয়াশিংটনের এই বাণিজ্য-কূটনীতির সমান্তরালে বেইজিংও আজ তাদের পাল্টা চালটি দিয়েছে। বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা) কমপ্লেক্সে রোববারই চীনা প্রতিষ্ঠান ‘ফ্ল্যারিশ গার্মেন্টস বাংলাদেশ কোম্পানি লিমিটেড’ চট্টগ্রামের মীরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে ১৫.৩৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ১৮৫ কোটি টাকা) বিনিয়োগের একটি চুক্তি সই করেছে। বেপজার নির্বাহী চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেনের উপস্থিতিতে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির অধীনে বছরে প্রায় ৪০ লাখ পিস উচ্চমানের বিভিন্ন ধরনের পোশাক উৎপাদিত হবে। প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় ১ হাজার ৯৮৮ জন বাংলাদেশি নাগরিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
এর আগে মার্চের তিন দিনের ব্যবধানে চীন ও হংকং থেকে বাংলাদেশে প্রায় ৫২.৫ মিলিয়ন ডলার বা ৬০০ কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগ নিশ্চিত হওয়া বেইজিংয়ের আগ্রাসী বাণিজ্যিক অবস্থানেরই প্রতিফলন। ওয়াশিংটন যখন শ্রম আইন ও নীতিগত সংস্কার নিয়ে দরকষাকষি করছে, চীন তখন সরাসরি এফডিআই (সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ) এবং অবকাঠামো উন্নয়নে দ্রুত চুক্তি সম্পন্ন করে মাঠ দখলে রাখার কৌশল নিয়েছে। চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন ইতিপূর্বেই সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, কোনো ‘তৃতীয় পক্ষ’ বা বহিঃচাপ চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ককে প্রভাবিত করতে পারবে না।
বিজিএমইএ ভবন থেকে বেপজা কমপ্লেক্স—আজকের সারাদিনের কর্মব্যস্ততাই প্রমাণ করছে যে, দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ এখন আর কেবল দাবার ঘুঁটি নয়, বরং পরাশক্তিদের রেষারেষির মাঝে নিজের শর্তে বাণিজ্য নিশ্চিত করা এক দক্ষ খেলোয়াড়।
২০২৬ সালের এই মার্চ মাসে ঢাকার মাটিতে বেইজিং ও ওয়াশিংটনের যে বাণিজ্য প্রতিযোগিতা দানা বাঁধছে, তাকে বাংলাদেশ তার সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক স্বয়ংসম্পূর্ণতার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের পাঠানো অভিনন্দন বার্তা ও উচ্চমানের সামরিক সরঞ্জামে প্রবেশাধিকারের ইঙ্গিত, অন্যদিকে চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ সহযোগিতার জোরালো আহ্বান—তারেক রহমানের সরকার দুই পরাশক্তিকে একে অপরের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতায় নামিয়ে সর্বোচ্চ জাতীয় সুবিধা আদায়ের কৌশল নিয়েছে।













